প্রচ্ছদ » আইন আদালত » বিস্তারিত
সুপ্রিম কোর্টে সপ্তাহে ২ দিন ভার্চুয়াল বিচার, আইনজীবীদের অসন্তোষ
২০২৬ এপ্রিল ২৩ ১৫:১৬:৪৩
স্টাফ রিপোর্টার : সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট উভয় বিভাগে বুধবার (২২ এপ্রিল) থেকে সপ্তাহে দুইদিন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনা শুরু হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে দুইদিন ধরে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করে আসছেন সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীরা।
এখন আরও কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন আইনজীবীরা। সেই সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিলে ও সমাবেশের ডাক দিয়েছেন আইনজীবীরা।
এই উপলক্ষে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তৎপরতা দেখানোর চেষ্টা করছেন। বিপুলসংখ্যক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন প্রাঙ্গণের সামনের চত্বরে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। এরপর বুধবারও নানা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন আইনজীবীরা। এরই ধারাবাহিক আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করার কথা রয়েছে।
এদিকে, অনলাইন পদ্ধতিতে (ভার্চুয়াল) আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করার অনুরোধ জানিয়ে সাধারণ আইনজীবীরা কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গেও। এরপর সবই তার পক্ষ থেকে আইনজীবীদের আন্দোলনের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে জানানো হয়েছিল। তাদের দাবি রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ আবুবক্কর সিদ্দিকী বিষয়টি প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করবেন বলেও সমিতিকে জানিয়েছেন। এখন দেখার পালা সুপ্রিম কোর্ট অনলাইন বা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে মামলা পরিচালনা থেকে সরে আসেন কিনা।
এর আগে, গত ১৯ এপ্রিল এক বিজ্ঞপ্তিতে সপ্তাহে দুই দিন বুধ ও বৃহস্পতিবার বিচার কাজ অনলাইনে (ভার্চুয়ালি) অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়। এতে বলা হয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন ২০২০ এবং হাইকোর্ট বিভাগে জারি করা প্র্যাকটিস ডাইরেকশন অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতি সপ্তাহে দুইদিন হাইকোর্ট বিভাগ ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এরপর মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের ভার্চুয়ালি বিচারকার্য পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ অনলাইনে (ভার্চুয়াল) পদ্ধতিতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আনলাইনে কোর্ট পরিচালনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের ডাক দেন সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীরা। ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগের দিন মঙ্গলবার এবং শুরুর দিন বুধবার দুপুরে সমিতির ভবন প্রাঙ্গণের বাইরে প্রথমে মানববন্ধন কর্মসূচি ও বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
এ সময় বক্তারা বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেওয়া হতো। কিন্তু এবারই প্রথম ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার আগে আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি।
তারা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমরা জেনেছি বিচারকরা এজলাসে বসে ভার্চুয়াল কোট পরিচালনা করবেন। লাইট ফ্যান এসি চলবে। তাহলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে কিভাবে? আর সরকার বলছে, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। এজন্য আমরা কোনোভাবেই ভার্চুয়াল কোর্ট চাই না।
আইনজীবীরা দাবি করেন, ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনা করা হলে মামলা নিষ্পত্তিতে প্রভাব পড়বে। তারা অবিলম্বে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানান।
সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসেই আইনজীবীদের শারীরিক উপস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আইনজীবী এম আশরাফুল ইসলামের সঞ্চালনায় বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. গিয়াস উদ্দিন, এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব, অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, ইয়ারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মোকছেদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান খান, মো. শাহজাহান, অ্যাডভোকেট মাকসুদ উল্লাহ, অ্যাডভোকেট এআর রায়হান, অ্যাডভোকেট নাজমুস সাকিব প্রমুখ।
২০২০ সালে করোনাকালে যখন পুরো বিশ্ব স্থবির, তখন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বিচারকাজ পরিচালিত হয়েছে ভার্চুয়ালি। সপ্তাহের কয়েকটা দিন এই মাধ্যমে বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হতো।
আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল কোর্টে মামলার কার্যক্রম গতিশীল উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ভার্চুয়াল কোর্টে আমি এখনো কোনো সমস্যা বোধ করিনি।
বুধবার নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আদালত পরিচালনাটা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সুনির্দিষ্ট করে থাকেন। তিনি আদালতের পদ্ধতি, বিচারকদের দায়িত্ব বণ্টন থেকে শুরু করে সব কিছু তার ওপরে নির্ভর করে। উনি মনে করেছেন সপ্তাহে দুই দিন ভার্চুয়াল কোর্টে সুবিধা হবে, সেই বিবেচনায় করেছেন। আমার এ কথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই ৭ এপ্রিল আমাদের ডেকে (বার সভাপতি, সেক্রেটারিসহ) ভার্চুয়াল কোর্টের কথা বলেছেন।’
‘তিনি পজিটিভ চিন্তা থেকে বলেছেন দুইটা দিন করলে জ্বালানির ওপর কিছুটা চাপ কমবে। সেটা আজকে থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে যদি কোনো অসুবিধা হয় তাহলে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করবো। আবার যদি এটাতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি সেটাও বলবো। এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সাময়িক। প্রয়োজনের পর আবার নিয়মিত আদালতের দিকে যাবেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে গত দিনের তুলনায় আজকে ভার্চুয়ালি আপিল বিভাগে মামলার কার্যক্রম গতিশীল মনে হয়েছে। আমি এখনো কোনো সমস্যা বোধ করিনি।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট সপ্তাহে দুইদিন অনলাইন পদ্ধতিতে চলবে বলে যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেটি ভ্রান্ত পদ্ধতি। এতে বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় হবে না, বরং আরও বাড়বে।
তিনি কারণ উল্লেখ করে বলেন, হাইকোর্টের একটি এজলাসে ৮০ জন আইনজীবী একত্রে বসে থাকবেন শুনানির জন্য, যেখানে দুটি এসি চলবে। আর অনলাইন পদ্ধতিতে চললে ৮০ জন আইনজীবী তাদের নিজ নিজ চেম্বারে বসে শুনানি করতে গেলে, জজ সাহেবের খাস কামরায় এসি চলবে, বেঞ্চ অফিসার বসবেন, সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় হবে না, বরং বাড়বে।
অনলাইন পদ্ধতিতে আদালত পরিচালনার ‘ভূত তাড়াতে’ শিগগির মিলাদ পড়ানোর আহ্বান জানান মামুন মাহবুব।
(ওএস/এএস/এপ্রিল ২৩, ২০২৬)
