ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

রূপপুর পারমাণবিকে জ্বালানি লোডিং ২৮ এপ্রিল 

২০২৬ এপ্রিল ২৪ ১৮:৪৮:০৫
রূপপুর পারমাণবিকে জ্বালানি লোডিং ২৮ এপ্রিল 

ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এ আগামী ২৮ এপ্রিল ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হতে যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন শুক্রবার সকালে বলেন, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ ও রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি কমিশনিংয়ের পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

তিনি আরও বলেন, এসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আযাদ, রাশিয়ার রাষ্ট্রিয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধি এবং রুশ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

সচিব জানান, “প্রক্রিয়া শুরুর তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। শুরুতে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে, যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া হবে।”

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে। একই সঙ্গে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডকে অপারেটিং এবং ৫২ জনকে অপারেটরকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

এর আগে লাইসেন্স জটিলতার কারণে ৭ এপ্রিল নির্ধারিত জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানান, কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয় সমাধানের পর বর্তমান পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান বলেন, “কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত লিখিত, মৌখিক ও সিমুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়েই কেন্দ্রটি পরিচালিত হবে।”

তিনি জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ফাইনাল সেফটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট প্রস্তুত করা হবে। কমিশনিং প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোর ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে এবং ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাস।

ড. জায়েদুলের মতে, প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষাগুলোতে এনপিসিবিএল-এর অপারেটররা রাশিয়ার অপারেটরদের সঙ্গে যৌথভাবে সফলভাবে পরিচালনার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, যা নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এই সাফল্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে আশাবাদ তিনি ব্যক্ত করেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে, জ্বালানি লোডিংকে সামনে রেখে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্পৃক্ততা জোরদারে ২৩ এপ্রিল প্রকল্প এলাকার নিকটবর্তী চরসাহাপুরে ‘উঠান বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয়রা অংশ নেন। বৈঠকে প্রকল্পের নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তি ও আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব সহজভাবে তুলে ধরা হয়।

প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন এসময় বলেন, “স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত।” তিনি গুজব এড়িয়ে সঠিক তথ্যের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম অনুসরণের আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হলে বিদ্যুৎ সংকট কমবে এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

উল্লেখ্য, পদ্মা নদীর তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটি ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করবে।

(এসকেকে/এসপি/এপ্রিল ২৪, ২০২৬)