ঢাকা, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শব্দ সচেতনতা আনবে এক শান্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী

২০২৬ এপ্রিল ২৯ ১৭:৩১:০২
শব্দ সচেতনতা আনবে এক শান্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী

ওয়াজেদুর রহমান কনক


মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নির্মল বায়ু বা বিশুদ্ধ পানির মতোই শব্দহীন শান্ত পরিবেশ অপরিহার্য। আধুনিক নগরায়ণের যুগে শব্দ দূষণ এখন এক অদৃশ্য ও নীরব ঘাতক, যা আমাদের শ্রবণশক্তি নষ্ট করার পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক উদ্বেগের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এটি কেবল মানুষের শারীরিক ক্ষতিই করে না, বরং শিশুদের মেধা বিকাশ এবং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্যকেও বিঘ্নিত করছে। তাই একটি শান্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে এই দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় শব্দের দাপট কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। শব্দহীনতার গুরুত্ব উপলব্ধি করাই হোক সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার।

আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস (International Noise Awareness Day) প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার পালিত হয়, যার লক্ষ্য হলো শব্দ দূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা। এই দিবসটি প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের Center for Hearing and Communication (CHC) এর উদ্যোগে। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে।

শব্দ দূষণ আজকের পৃথিবীর অন্যতম উপেক্ষিত পরিবেশগত সমস্যা। শহরাঞ্চলে যানবাহনের গতি, হর্ণ, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার এবং জনসমাগমের শব্দ – সবকিছু মিলিয়ে শব্দ দূষণ মানুষের জীবনে এক নীরব অথচ গভীর হুমকি হিসেবে উপস্থিত। এই ধরনের অবিরাম শব্দ আমাদের শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক উদ্বেগ ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

শব্দ দূষণ শিশুদের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলে। তাদের মনোযোগ কমে যায়, শেখার গতি ধীর হয় এবং আচরণে পরিবর্তন আসে। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রেও উচ্চমাত্রার শব্দ ভ্রূণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শব্দ দূষণ প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।

আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে কর্মসূচি নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—নীরবতা পর্যবেক্ষণ মুহূর্ত পালন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শব্দ দূষণবিরোধী আলোচনা ও সেমিনার আয়োজন, গণমাধ্যমে প্রচারণা, পোস্টার ও ভিডিও ক্যাম্পেইন, এবং শহরের ট্রাফিক পয়েন্টে সচেতনতামূলক ব্যানার প্রদর্শন। অনেক দেশ এদিন নাগরিকদের আহ্বান জানায়—এক নির্দিষ্ট সময় ‘নীরবতা পালন’ করে শব্দহীন পরিবেশের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে।

বাংলাদেশেও শব্দ দূষণ একটি মারাত্মক সমস্যা। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ট্রাফিক, হর্ণ, নির্মাণকাজ ও মাইক ব্যবহারের কারণে শব্দের মাত্রা অনেক সময় সহনীয় সীমার চেয়ে অনেক বেশি থাকে, যা আইনত অপরাধ হলেও সচেতনতার অভাবে তা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে শব্দ দূষণ রোধে অভিযান চালায় এবং নিয়ম অনুযায়ী 'শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬' অনুসারে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শুধু পরিচ্ছন্ন বায়ু বা পানি নয়, শান্তিপূর্ণ ও শব্দহীন পরিবেশও অপরিহার্য। এই দিবস আমাদের একটি বার্তা দেয়—"Listen to the Silence"—কারণ কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী আওয়াজ।
আপনার দেওয়া তথ্যগুলো সত্যিই চমৎকার এবং শব্দ দূষণের ভয়াবহতা বুঝতে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর। পয়েন্ট আকারে না লিখে, তথ্যগুলোকে একটি নিরবচ্ছিন্ন এবং তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ হিসেবে নিচে উপস্থাপন করা হলো:

শব্দ দূষণ কেবল আমাদের মেজাজ খিটখিটে করে না, বরং এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ৫৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের মধ্যে বসবাস করলে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। উচ্চ শব্দ শরীরে কর্টিসল (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি আমাদের ধমনীর ক্ষতি করে। এমনকি রাতের বেলার শব্দ দূষণ আমাদের বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজমকেও বাধাগ্রস্ত করে, যা থেকে ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো জীবনঘাতী রোগ দেখা দিতে পারে।

এই দূষণের প্রভাব শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকেও এটি সংকটে ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের পাখিরা কোলাহলের কারণে তাদের স্বাভাবিক সুর পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে; তারা এখন আগের চেয়ে অনেক উচ্চস্বরে এবং ভিন্ন কম্পাঙ্কে গান গায়। এমনকি সমুদ্রের তলদেশেও জাহাজের ইঞ্জিন ও সোনার (Sonar) সিস্টেমের শব্দ তিমি বা ডলফিনের মতো প্রাণীদের যোগাযোগ ও দিকনির্ণয় ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।

আধুনিক বিশ্ব এখন এই সমস্যা মোকাবিলায় ‘স্মার্ট’ ও ‘গ্রিন’ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। অনেক উন্নত দেশে রাস্তায় বিশেষ ধরনের শব্দ নিরোধক অ্যাসফল্ট বা পিচ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা টায়ারের ঘর্ষণজনিত শব্দ শুষে নেয়। লন্ডন বা বার্লিনের মতো শহরগুলোতে ডিজিটাল ‘নয়েজ ম্যাপ’ ব্যবহার করে শব্দের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা শব্দ নিরোধক দেয়াল নির্মাণ করা হয়।
আইনিভাবেও শব্দের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যেমন—হাসপাতাল বা স্কুলের মতো শান্ত এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, এবং আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল সীমা মেনে চলা উচিত। তবে কেবল আইন দিয়ে এটি রোধ করা সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো পরিহার করা, ঘরের ভেতরে টেলিভিশন বা মিউজিক সিস্টেমের ভলিউম সীমিত রাখা এবং উৎসবে উচ্চশব্দের আতশবাজি বন্ধ করা জরুরি। এছাড়া প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে বাড়ির চারপাশে বৃক্ষরোপণ করা যেতে পারে, কারণ গাছপালা চমৎকার ‘সাউন্ড ব্যারিয়ার’ হিসেবে শব্দ শোষণ করে নিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য বায়ু ও পানির মতো একটি শব্দহীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশও অপরিহার্য। আমাদের ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শান্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।