ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শিকাগোর রক্তে কেনা শ্রমিকের মৌলিক মানবাধিকারের দলিল

২০২৬ এপ্রিল ৩০ ১৭:২৫:৫৩
শিকাগোর রক্তে কেনা শ্রমিকের মৌলিক মানবাধিকারের দলিল

ওয়াজেদুর রহমান কনক


মহান মে দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে শ্রমজীবী মানুষের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং শৃঙ্খল মুক্তির এক মহাকাব্যিক দলিল। এই দিবসের তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি পুঁজিবাদের আগ্রাসী বিকাশের বিরুদ্ধে শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রথম সফল বৈশ্বিক প্রতিরোধ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যখন উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকের মধ্যে চরম অসমতা বিরাজ করছিল, তখন ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তঝরা সংগ্রাম এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের জন্ম দেয়। এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল—শ্রমিক কোনো পণ্য নয়, বরং সে জীবন্ত সত্তা যার বিশ্রাম, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের অধিকার রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে মে দিবসের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের লড়াইয়ের মধ্যে। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদনের যে দাবিটি সেদিন উত্থাপিত হয়েছিল, তা মূলত মানুষের মৌলিক মানবাধিকারেরই প্রতিফলন। মার্কসীয় অর্থনীতি ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মে দিবস হলো ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ (Surplus Value) শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। শ্রমিকদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পুঁজির চেয়ে শ্রমের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। এটি শ্রেণি-সংগ্রামের ইতিহাসে এমন এক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে যা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) গঠন এবং বিশ্বব্যাপী শ্রম আইন প্রণয়নে ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে।

গভীরতায় মে দিবস একটি বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক। এটি জাতীয়তাবাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানের মাধ্যমে এক অখণ্ড মানবিক ভ্রাতৃত্বের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক শিল্পায়িত বিশ্বে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশনের প্রভাবে শ্রমবাজারের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হচ্ছে, তখনো মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বরং বর্তমানের ‘গিগ ইকোনমি’ বা অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মে দিবসের শিক্ষা আজও দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রদান এবং যে কোনো প্রকার বৈষম্য দূর করার মাধ্যমেই মে দিবসের প্রকৃত নির্যাস বাস্তবায়িত হয়। তাই মে দিবস মানে শুধু রাজপথের মিছিল নয়, এটি হলো মানব সভ্যতার বিবর্তনে শ্রমের অবিচ্ছেদ্য শ্রেষ্ঠত্ব এবং মানবিক মর্যাদার এক অবিনশ্বর ঘোষণা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহান মে দিবসের গুরুত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে যখন আমরা সংখ্যাতাত্ত্বিক ও পরিসংখ্যানগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি, তখন এই দিবসের তাৎপর্য আরও মূর্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ সরাসরি শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির হার প্রায় ৭২.২৮ শতাংশ, যার মধ্যে পুরুষ শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ৪৮.০৪ শতাংশ এবং নারীর অংশগ্রহণ ২৪.২৪ শতাংশ। দেশের জিডিপিতে এই শ্রমশক্তির অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫ অর্থবছর শেষে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯.৫ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১-৮৫ শতাংশ। এই একটি মাত্র খাতে প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক সরাসরি কর্মরত, যাদের বিশাল অংশ নারী। তাদের শ্রমের বিনিময়েই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার কেবল দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে, প্রায় ১২ লক্ষাধিক বাংলাদেশি বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। জানুয়ারি ২০২৬-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র এক মাসেই প্রায় ৯৪,১৮৯ জন শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে এবং জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মে দিবসের মূল চেতনা—ন্যায্য মজুরি—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি চলমান লড়াই। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করে ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৮,০০০ টাকা। যদিও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় শ্রমিক সংগঠনগুলো আরও উচ্চতর মজুরির দাবি জানিয়ে আসছে, তবুও এই বৃদ্ধি শ্রম অধিকার আদায়ের আন্দোলনেরই একটি ফসল। বর্তমানে সরকার ও আইএলও (ILO)-র যৌথ উদ্যোগে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইন সংশোধনীর কাজ চলমান রয়েছে, যা মে দিবসের মূল দর্শনেরই বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, তখন মে দিবসের গুরুত্ব এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ৮৪ শতাংশ শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া প্রযুক্তিগত বিপ্লব বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশনের এই যুগে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা মে দিবসের আধুনিক তাৎপর্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, মে দিবস বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার সুরক্ষা কবচ। শিকাগোর হে মার্কেটের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আজও বাংলাদেশের ক্ষেত-খামার, কল-কারখানা এবং প্রবাসে কর্মরত কোটি শ্রমিকের ঘামঝরা পরিশ্রমে বেঁচে আছে। এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির পাশাপাশি শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নই হতে হবে আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।