ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

খেয়ে-পরে বাঁচার স্বপ্ন ও মে দিবস

২০২৬ এপ্রিল ৩০ ১৭:৩৪:১৬
খেয়ে-পরে বাঁচার স্বপ্ন ও মে দিবস

মানিক লাল ঘোষ


১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে 'আট ঘণ্টা কর্মদিবস' স্বীকৃত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি নিয়ে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশের শ্রম অধিকারের ইতিহাসে ১৯৭২ সালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ২২শে জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও (ILO)-র পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। এর পরপরই বাংলাদেশে মে দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন শুরু হয় এবং পহেলা মে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রমিকদের ভাগ্যন্নোয়নে শেখ হাসিনা সরকারের আমল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক। সেই সময়ে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কয়েক দফায় বৃদ্ধি করে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল। নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন ছিল এক অনন্য উদাহরণ। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সেক্টরে বেতন কাঠামো সংস্কার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় শ্রমিকের অধিকারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের খেয়ে-পরে টিকে থাকার সংগ্রাম। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে সাধারণ শ্রমিকের নাভিশ্বাস উঠছে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে। চাল, ডাল, চিনি থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০-৮৫০ টাকা কিংবা ব্রয়লার মুরগি ২১০-২২০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় শ্রমিকের পাতে পুষ্টিকর খাবার এখন অলীক স্বপ্ন। সয়াবিন তেল কিংবা ডাল কিনতে গিয়েও একজন শ্রমিককে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যেখানে আয় স্থির, সেখানে বাজারের এই চড়া দাম শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়া কোনো বিলাসিতা নয়, কেবল দুবেলা দুমুঠো অন্ন সংস্থান করা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ৫ই আগস্টের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং তার সরকার শ্রমিকবান্ধব হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি মনোযোগী ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউনূস সরকারের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার আসলে শ্রমিকরা যে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেছিল, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা সেই স্বপ্নকে ফিকে করে দিয়েছে। শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার শ্রমিক সমাজ। তাই শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন কেবল দয়া নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবিলম্বে শ্রমিকদের জন্য নামমাত্র মূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি। বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো দ্রুত সংস্কার না করলে শ্রমিকদের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সেই সাথে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।

শ্রমিক কেবল উৎপাদনের হাতিয়ার নয়; তারা উন্নয়নের কারিগর। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক এবং সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে মে দিবসের চেতনা লুণ্ঠিত হবে। বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, বিশেষ করে খেয়ে-পরে বাঁচার নিশ্চয়তা ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করাই হোক এবারের মে দিবসের মূল অঙ্গীকার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।