ঢাকা, রবিবার, ৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » রাজনীতি » বিস্তারিত

দলিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় জাতীয় জনজাতি জোটের আত্মপ্রকাশ

২০২৬ মে ০৩ ১৪:৩৪:২৪
দলিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় জাতীয় জনজাতি জোটের আত্মপ্রকাশ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের দলিত, হরিজন, তফসিলি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সুরক্ষায় এবং পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে জাতীয় জনজাতি জোট আত্মপ্রকাশ করেছে।

শনিবার (২ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উদ্যোগে এ জাতীয় জনজাতি জোট আত্মপ্রকাশ করে।

ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্রাব মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করেন।

জাতীয় জনজাতি জোটের আহ্বায়ক হয়েছেন ডেভিড রাজু। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রাজেন্দ্র কুমার দাস, যুগ্ম আহ্বায়ক মানিক বরাইল, সদস্য সচিব কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব অরুণা রানী দাস, যুগ্ম সদস্য সচিব নিপু দাস, সাংগঠনিক সম্পাদক হৃদয় দাস, সিনিয়র সহসাংগঠনিক সম্পাদক তাঁতপুরী জেমস বিশ্বাস, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দীপু দাস, সংগঠক চন্দর কুমার বাসফ, সংগঠক হেনা রানী, সংগঠক বরশেটি ত্রিনা আদা।

এর আগে অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে আখতার হোসেন বলেন, এ দেশের দলিত হরিজন রবিদাস এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, যেখান থেকে আজ বাংলাদেশ তার পক্ষে তারা অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।

সে সময়টাতে যদি দলিত হরিজন রবিদাস এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাংলাদেশের পক্ষে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত না করতেন তাহলে হয়ত আজ আমরা বাংলাদেশের যে মানচিত্র দেখি মানচিত্রটা এমন নাও হতে পারতো। সেই ৪৭ এর দেশভাগের পর পাকিস্তান গিয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরে পেয়েছি ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটা কথা ছিল সাম্য মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার আমরা প্রতিষ্ঠা করব। ৭১’এর পরে আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে। আমাদের কাঠামোগত জায়গায়, অনেকগুলো জায়গায় সময় সময়ে আমরা অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু সাম্য মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচারের যে বার্তার কথা আমরা বলেছিলাম, সে বিষয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে যদি কোনো জনগোষ্ঠী থেকে থাকে, তারা এই দলিত হরিজন রবিদাস এবং সম্প্রদায়ের মানুষ। দলিত হরিজন, রবিদাস এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ না আমরা তাদেরকে একটা সাম্যের সমাজ দিতে পেরেছি, না মানবিক মর্যাদা দিতে পেরেছি, না সামাজিক সুবিচার আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। দলিত হরিজন রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষরা যতটুকু মর্যাদা পাওয়ার কথা, সেই মর্যাদাটুকু তারা পান না। যারা পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন সে পরিচ্ছন্নতার কাজ আসার পরে তাদেরকে কোনো হোটেলে ঢুকতে দেওয়া হয় না, খাবার খেতে দেওয়া হয় না।

তিনি বলেন, আজ যখন আমরা জনজাতি জোটের আত্মপ্রকাশ নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি, এখানে রাজনীতি আমাদের মুখ্য বিষয় নয়। জাতীয় নাগরিক পার্টিও এখানে মুখ্য বিষয় নয়। এখানে মুখ্য বিষয় এ সম্প্রদায়ের মানুষেরা। কারণ আমরা দেখেছি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আছেন তফসিলি জনজাতি দলিত হরিজন রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষ তাদেরকে ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয় নাই। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলে পরে সবার প্রথম যারা লক্ষ্যবস্তু হন তারা এই নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। এই কারণে আমরা এই বর্ণপ্রথার যে কুপ্রভাব সেখান থেকে মুক্তির একটা স্বপ্ন দেখি। আপনারা জানেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি আমাদের এই পার্টির দলের নামের মধ্যে নাগরিক শব্দটি আছে। যে নাগরিক শব্দটি আমাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি। অর্থাৎ এই বাংলাদেশের কোনো মানুষকে আমরা কোনো ধর্মের পরিচয় না, কোনো বর্ণের পরিচয় না, স্থানের পরিচয়ও না। আমরা এ বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা তাদেরকে দেখতে চাই। সে হিসেবে আমরা তাদেরকে মূল্যায়ন করতে চাই। এ জায়গায় শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে না, এ সমাজের একজন মানুষ হিসেবেও। বাংলাদেশের আপামর জনতার কাছে আমার আকুল আবেদন থাকবে, আমরা যেন মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারি। আমরা যেন মানুষ হিসেবে তার যতটুকু মর্যাদা সেটা যেন আমরা তাদেরকে প্রদান করতে পারি। আমরা যেন আর কখনোই কোথাও এ কথা না শুনি যে বাংলাদেশের কোনো একটা হোটেলে দলিত হরিজন রবিদাস বা তফসিলি সম্প্রদায়ের কেউ গিয়েছেন এবং তাকে হোটেলের বাইরে খাবার খেতে হয়েছে।

আখতার হোসেন বলেন, হোটেলের প্লেটে করে হোটেলের টেবিলে বসে তিনি খাবারটা খেতে পারেন নাই। এই ধরনের বর্ণপ্রথার কুপ্রভাব আমাদের সমাজে যেন আর অবশিষ্ট না থাকে সেই ব্যাপারে বাংলাদেশের আপামর জনতা সকলের কাছে আমি আকুল কণ্ঠে অনুরোধ জানাতে চাই। আমাদের দলিত হরিজন রবিদাস এবং সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে সংকটের মধ্যে আছেন, সেটাকে আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবেও সমাধান করতে হবে। সামাজিকভাবেও এটার একটা সমাধান প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজন এই কারণেই যে তারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সেন্সাসের দাবি জানিয়ে আসছেন যে একটা আদমশুমারি হোক তারা সংখ্যায় আসলে কত, সরকারি হিসেবে সেটা ৬৫ লাখের মতো বলা হয়। কিন্তু তাদের নিজেদের যতদূর পরিধি তারা দেখেন সেটা কোটির ওপরে, দেড় কোটির কাছাকাছি। এই যে সংখ্যার হেরফের এটা থেকে তারা নিস্তার চান। এনসিপি সবসময় বাংলাদেশের দলিত হরিজন রবিদাস সম্প্রদায়ের পাশে থাকবে সে আশাবাদ ব্যক্ত করি।

এতে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আদিব আরিফ, যুগ্ম সদস্য সচিব মোল্লা মো. ফারুক এহসান, দলিত জনগোষ্ঠীর নেতা রাজা রয়, হৃদয় দাস প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের দলিত, হরিজন, তফসিলি জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের প্রতি জরুরি কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো– ১) দলিত, তফসিলি, হরিজন জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। ২) সংশোধনীসহ বৈষম্য বিলোপ আইন-২০১১ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩) দলিত, তফসিলি, হরিজন জনগোষ্ঠীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। ৪) জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সব কাঠামোতে সংখ্যানুপাতিক হারে এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ৫) সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। ৬) ভূমিহীন এই জনগোষ্ঠীকে মালিকানাসহ স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যমান জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১ এবং সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৬ সংস্কার করে এই জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। ৭) শিক্ষার প্রাথমিক স্তরের সিলেবাসে দলিত জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করতে হবে, যা বিদ্যমান সামাজিক ভেদাভেদ ও বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখবে। ৮) এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে। ৯) এই জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে সম্প্রদায়ভিত্তিক সঠিক সংখ্যা নিরূপণের লক্ষ্যে নৃতাত্ত্বিক জরিপ করতে হবে। ১০) এই জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি দেখার জন্য একটি বিশেষায়িত কমিশন গঠন করতে হবে। ১১) প্রতিটি কলোনি পাড়াতে সরকারিভাবে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ/সংস্কার করতে হবে। ১২) সেবা প্রদানে অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করার লক্ষ্যে বিদ্যমান জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি-২০১১ তে দলিত তফসিলি, হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। ১৩) স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। ১৪) জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল ২০১৫ সংস্কার করে এই জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং বন্ধ করে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দিতে হবে।

(ওএস/এএস/মে ০৩, ২০২৬)