ঢাকা, রবিবার, ৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে কারাবন্দি সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংকট

২০২৬ মে ০৩ ১৮:১২:২৩
মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে কারাবন্দি সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংকট

মানিক লাল ঘোষ


বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩ মে-কে এই দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কোর উদ্যোগে উইন্ডহুক ঘোষণার স্মরণে প্রচলিত এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো—গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিগুলো উদযাপন করা, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থা মূল্যায়ন করা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আক্রান্ত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো।

তবে বাংলাদেশে এবারের মুক্ত গণমাধ্যম দিবসটি এমন এক প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে, যখন দেশের সাংবাদিকতা এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের চেয়ে আরও তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম স্থানে নেমে এসেছে। এই অবনমনই বলে দেয়, এ দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ কতটা সংকুচিত হয়েছে।

বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ও পরিচিত সাংবাদিক দীর্ঘ সময় ধরে বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে। ভিন্ন ভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের কারাগারে রাখা হয়েছে। একইভাবে সেপ্টেম্বর মাসে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। বারবার জামিন আবেদন নাকচ হওয়ায় তারা আজও কারান্তরীণ।

পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও গবেষক, মানবাধিকার কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সমাদৃত প্রবীণ সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ এবং একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন সাথী। রাজনৈতিক রোসানল ও ষড়যন্ত্র মূলক মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে থেকে বর্তমানে জামিনে আছেন বিএফইউজে"র সাবেক সভাপতি মোল্লা জালাল, সাংবাদিক ও টকশো ব্যক্তিত্ব আনিস আলমগীর, মঞ্জুরুল আলম পান্না, ডিআরইউ"র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ জামাল প্রমুখ।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান চিত্রকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এবং টিআইবির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েকশ সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশকে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত সহিংস মামলার আসামি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিন দফায় ১৬৮ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার নামান্তর।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর হাতে গত এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে চারজন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন।

গণমাধ্যমের ওপর এমন ধারাবাহিক নিপীড়ন, একের পর এক সাংবাদিককে কারারুদ্ধ করা, ঢালাও মামলা এবং মব জাস্টিসের আতঙ্ক নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে মুক্ত গণমাধ্যমের ধারণা কতটুকু সফল হবে—তা আজ বড় প্রশ্ন। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রত্যাশা হোক, সত্য বলার অপরাধে কোনো সাংবাদিককে যেন বিনা বিচারে কারাগারে থাকতে না হয়। গণমাধ্যম দখল ও হয়রানি বন্ধ করে একটি ভয়হীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক এই দিবসের মূল অঙ্গীকার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।