ঢাকা, সোমবার, ৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » অর্থ ও বাণিজ্য » বিস্তারিত

৯ বছরে পাঁচ লাখ নারীর পাশে ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ 

২০২৬ মে ০৪ ১৮:৩০:০৪
৯ বছরে পাঁচ লাখ নারীর পাশে ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ 

স্টাফ রিপোর্টার : আজ সোমবার নবম বছরে পদার্পণ করল ব্র্যাক ব্যাংকের উইমেন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘তারা’। দেশের ৫ লাখ নারী এখন এই অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকিং সেবা নিচ্ছেন। কেবল একটি ব্যাংকিং সেবা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও গত নয় বছরে ‘তারা’ হয়ে উঠেছে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে নারীদের রিটেইল ডিপোজিট পোর্টফোলিওর প্রায় ২৫ শতাংশই আছে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ সেগমেন্টে।

২০১৭ সালের ৪ মে যাত্রা শুরু করা ‘তারা’র মূল দর্শন ছিল রিটেইল থেকে এসএমই— প্রতিটি ধাপে নারীর আর্থিক যাত্রায় পাশে থাকা। ব্যাংকটির এই বিশেষায়িত সেবাটি মূলত দুটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে— ‘তারা রিটেইল’ এবং ‘তারা এসএমই’। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে নিজের ব্যবসাকে সম্প্রসারণ— সব ক্ষেত্রেই নারীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘তারা’।

‘তারা রিটেইল’: নারীর আর্থিক প্রয়োজন পূরণে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা

কর্মজীবী নারী, গৃহিণী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক— দেশের আটটি বিভাগের সকল নারীর জন্য ‘তারা রিটেইল’ সাজিয়েছে আলাদা আলাদা ব্যাংকিং সেবা। বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার নারী গ্রাহকের মোট ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ডিপোজিট রয়েছে।

গত ৯ বছরে ‘তারা’র গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে ৮০ গুণ এবং ডিপোজিটের পরিমাণ বেড়েছে ৬০ গুণেরও বেশি। বিশেষ করে ‘হোমমেকার্স অ্যাকাউন্ট’ গৃহিণীদের জন্য আয়ের প্রমাণের বাধা দূর করেছে এবং এখানকার ৯৮ শতাংশ গ্রাহককেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে (ইকেওয়াইসি) অনবোর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল সেভিংস অ্যাকাউন্ট ও ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে আধুনিক ব্যাংকিং পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে।

ব্যাংকিং সেবার বাইরেও মা দিবস, স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মতো দিনগুলোতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নারীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষায় কাজ করছে ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’। এছাড়াও ‘তারা’ অ্যাম্বাসেডর ট্রেনিং প্রোগ্রামের আওতায় ১২০ জন ফ্রন্টলাইন সহকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নারী গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে পারেন।

‘তারা এসএমই’: নারী উদ্যোক্তাদের শক্তির উৎস

১ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে সেবা দিচ্ছে ‘তারা এসএমই’। এখানে লোনের পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ডিপোজিটের পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে ডিপোজিটে শুধু গত এক বছরেই ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার মাত্র ১.১৪ শতাংশ, যা প্রমাণ করে যে, নারীদের অর্থায়ন করা ব্যাংকের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর।

উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ‘তারা উদ্যোক্তা মেলা’ এ পর্যন্ত চারটি বড় ইভেন্টের আয়োজন করেছে, যেখানে ৩০০-এরও বেশি নারী উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন এবং তাঁদের পণ্যের বিশাল বাজার তৈরির সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে ‘উদ্যোক্তা ১০১’ কর্মসূচির ১৯তম ব্যাচ চলছে, যার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৫০০-এরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ট্যাক্সেশন এবং মার্কেটিং বিষয়ে দক্ষ করে তোলা হয়েছে।

এছাড়াও, দেশজুড়ে ৩৩টি জেলায় প্রায় ১,২০০ নারী উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছে গেছে ‘আমরাই তারা’। পাশাপাশি ‘উদ্যোগতারা’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি বছর ১,০০০-এরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে মার্কেট এনলিস্টমেন্ট ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দেশের ৬৪টি জেলার ১৯১টি শাখায় পরিচালিত ‘ডব্লিউএসএমই (WSME) ব্রাঞ্চ ট্রেনিং প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রতি বছর ২,০০০-এরও বেশি নারী উদ্যোক্তাকে আর্থিক সাক্ষরতা এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

এমনকি ২ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে বিনামূল্যে এক বছরের জন্য ইআরপি সফটওয়্যার দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা তাদের ব্যবসা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে পারেন।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গৌরব

বিশ্বব্যাপী ১৩৫টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এবং নারী অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করা নিউইয়র্কভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন-এর ৮১টিরও বেশি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকই বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংক, যারা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৭টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জনের গৌরব অর্জন করেছে।

বিগত বছরগুলোতে ‘তারা’ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর উইমেন থেকে অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ধারাবাহিকভাবে তিনবার ‘উইমেনস মার্কেট চ্যাম্পিয়ন এনগেজমেন্ট এশিয়া অ্যাওয়ার্ড’; ২০২০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চার বছর ‘অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স চ্যাম্পিয়ন’ অ্যাওয়ার্ড; এবং সর্বশেষ উগান্ডার কাম্পালায় অনুষ্ঠিত ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য ফিমেল ইকোনমি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’-এ ‘জেন্ডার ডেটা চ্যাম্পিয়ন’ সম্মাননা। বাংলাদেশের নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে জেন্ডার-সেগ্রিগ্রেটেড তথ্যের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

এছাড়াও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আইএফসি এবং এসএমই ফাইন্যান্স ফোরাম আয়োজিত ‘গ্লোবাল এসএমই ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ডস’-এ ‘তারা’ সম্মাননা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংক গ্লোবাল এবং এশিয়া— উভয় ক্যাটাগরিতে ‘প্রোডাক্ট ইনোভেশন অব দ্য ইয়ার – বেস্ট কমার্শিয়াল ব্যাংক’ হিসেবে প্ল্যাটিনাম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে।

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলো ‘তারা’-কে কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত একটি ব্যাংকিং মডেলে পরিণত করেছে।

‘তারা’র সাফল্য নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, নারীরা কেবল ব্যাংকিং সেবার কোনো খণ্ডিতাংশ নয়, বরং তারা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সেগমেন্ট, যারা পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার দাবিদার।”

তিনি আরও বলেন, “উইমেন ব্যাংকিং সেগমেন্টে আমাদের গত ৯ বছরের অর্জন এবং লাখ লাখ নারীর জীবনে নিয়ে আসা ইতিবাচক পরিবর্তন আমাদের সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। আমাদের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি; বলা যায়, এটি এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা মাত্র। নারীদের আর্থিক প্রয়োজনে সবসময় পাশে থাকবে ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’।”

(পিআর/এসপি/মে ০৪, ২০২৬)