প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
পুরোনো মালিকের কাছে ব্যাংকের মালিকানা ফিরানোর যৌক্তিকতা
২০২৬ মে ০৪ ১৯:৩৪:১৯
চৌধুরী আবদুল হান্নান
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের (সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক) মালিকানা আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রেখে আইন করেছে সরকার। এমন সিদ্ধান্তকে একটি বড় ভুল বলে মনে করেন অনেকে, এ কাজটি ভালো হবে না বলে সতর্ক করেছেন দেশের খ্যতিমান কয়েকজন অর্থনীতিবিধ।
স্বৈরচারী সরকারের সময় কয়েকজন ব্যবসায়ী ব্যাংকের সব টাকা নিয়ে গেল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকে বিদেশে পালালো এবং কেউ বন্দী কারাগারে। তখন ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীগণ সরকারের অনৈতিক নির্দেশ মেনে নিয়ে কাজ করেছেন। কেউ প্রতিবাদ করেননি, পদত্যাগ করা তো দূরের কথা। ব্যাংকের টাকা লুটপাট করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, অবারিত সুযোগ পেলে কয়জনই বা লোভ সম্বোরণ করতে পারে! টাকা তো মধুর চেয়ে মিস্টি।
বিগত দিনে কোনো সরকার ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং লাখো আমানতকারীর জমানো টাকা চরম ঝুঁকিতে ফেলে তাদের বিভিন্নভাবে বিধিবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের (সরকারের) যথারীতি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংকটে পড়া ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া সরকারের আইনি অঙ্গীকার।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাচারকারীদের সাথে আপসরফার মাধ্যমে টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নকে প্রধান করে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল।
আপস করার প্রস্তাব দুর্বলের পক্ষ থেকে আসে, এখানে ব্যাংক পক্ষ দুর্বল আর ওই সকল ব্যবসায়ী-গ্রাহক প্রবল শক্তিশালী। আর যার টাকা আছে, আইন তার পক্ষে থাকে। তারা জানে টাকা কীভাবে কোথায় খরচ করতে হয় এবং তদন্তকে প্রভাবিত করার কৌশল। টাকাই তার সব কাজ করে দিবে, নিজের বাড়তি কিছু করতে হবে না।
প্রতিপক্ষকে আটকানোর কোনো পথ যখন থাকে না, সেখানে সমঝোতা করার চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ।
বর্তমান অবস্থায় দেশের ব্যবসা বানিজ্য ও আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতে ব্যবসায়ীদের সাথে সমঝোতার লক্ষ্যে এখনই আলোচনা শুরু করতে হবে। সবই তো লুট হয়ে গেছে, কিছু যদি ফেরত পাওয়া যায়।
আগের সরকারগুলো ঋণখেলাপিদের বিধিবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে তাদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি করে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার খেলাপি ও পাচারকারীদের সাথে সমঝোতার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার তা এগিয়ে নিতে পারে।
অনেক সময় প্রচলিত বিধি-বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সঠিক কাজটি করতে হয়, আওয়ামী শাসনামলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, পালিয়ে বেড়িয়েছন, কারাগারে ছিলেন, ব্যবসা পরিচালনা না করতে পেরে খেলাপি হয়েছেন, তাদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবী রাখে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়োজিত দক্ষ ও বিচক্ষণ কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যাংকার এখনই একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পূরোনো শেয়ারহোল্ডার/মালিকদের সাথে আলোচনা শুরু করতে পারেন। ব্যাংক মালিকানা নতুনদের হাতে দেওয়া আরও বিপজ্জনক, তারা লুটপাটে আরও সাহসী হবে। কারণ তারা দেখবে ব্যাংকের টাকা লুটপাটকারী বা পাচারকারীদের অতীতে কোনো বিচার হয়নি। তাদের পাকড়াও করার জন্য আইনের হাত যেখানে যথেষ্ট শক্ত নয়, আইন প্রয়োগ করে ক্ষমতাশালী পাচারকারীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ে অতীতে তেমন কোনো নজিরও নেই, সেখানে তাদের সাথে আপসরফাই একমাত্র পথ।
বাংলাদেশের সব চেয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাপী অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী প্রয়াত সাইফুর রহমান এক অনুষ্ঠানে ঋণখেলাপিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন— আল্লাহর দোহাই আপনারা ব্যাংকের পাওনা টাকা পরিশোধ করুন। তাঁর এ আহবান স্পষ্ট অসহায়ত্তের প্রকাশ। অর্থ উদ্ধারের সকল প্রচেষ্টা, এমন কি আইনি প্রক্রিয়া যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে তখন এমনই হয়।
তিন দশকেরও বেশি সময় পূর্বে একজন জাঁদরেল অর্থমন্ত্রীর এমন অসহায়ত্ত বলে দেয় ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারীরা বরাবরই বেপরোয়া এবং অনেক সময় মনে হবে তারা সরকারের চেয়েও ক্ষমতাশালী।
পুরোনো মালিকদের নিকট আলোচিত ব্যাংকের মালিকানা আবার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্ষকাতর, লোকে বলবে সরকার অর্থলোপাটকারীদের সাথে হাত মিলিয়েছে। বর্তমান সরকার আমানতকারীদের কথা না ভেবে আগের সরকারের মতো অপরাধীদের নতুন করে সুযোগ দিচ্ছে।
তবে যে যা বলুক, দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তটা সরকারকেই নিতে হবে।
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন— “অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে, যেগুলো জনপ্রিয় নাও হতে পারে। একটি কঠিন অবস্থা থেকে বের হতে গেলে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
আপসরফার অন্যতম শর্ত হবে— আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত পরিমান টাকা জমা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঋণ হিসাবগুলো নিয়মিত করতে হবে এবং নতুন করে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না, তবে পর্যায়ক্রমে ঋণ হিসাবগুলো নিয়মিত করার শর্তে সীমার মধ্যে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।
অতঃপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দক্ষ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমস্যা সংকুল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সঠিক পথ খুঁজে পাবে, এমন প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব্যাংক।
