ঢাকা, বুধবার, ৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান, মমতা ব্যানার্জীর বিদায়

২০২৬ মে ০৬ ১৭:২৬:৪৫
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান, মমতা ব্যানার্জীর বিদায়

শিতাংশু গুহ


অবশেষে মমতা ব্যানার্জী’র পতন হলো, বিদায় মমতা দিদি, বিদায় তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ বছর কংগ্রেস (কোয়ালিশন, রাষ্ট্রপতি শাসন সহ), ৩৪ বছর সিপিএম, ১৫ বছর তৃণমূল রাজত্ব করেছে। এই প্রথম বিজেপি জয় পেলো। এরফলে পূর্ব-ভারত গেরুয়াময় হয়ে পড়লো। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা সর্বত্র বিজেপি, বাদ শুধু ঝাড়খন্ড। মূলত দক্ষিণ বাদে প্রায় পুরো ভারতে বিজেপি রাজত্ব করছে। ক্ষমতা হারানোর পর পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও সিপিএম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, হয়তো আগামী দিনে তৃনমূলের একই দশা হবে? বাংলায় তৃণমূলের দুর্দিন শুরু, চুরির দায়ে অভিষেক ব্যানার্জী থেকে বড় বড় নেতারা জেলে যাবেন। তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী যারা অধিকাংশ মুসলিম, তারা অনেকে ইতিমধ্যে আত্মগোপনে চলে গেছেন, কেউ কেউ পালিয়ে বাংলাদেশ বা অন্য ষ্টেটে চলে যাবেন?

বিজেপি প্রতিহিংসা-পরায়ণ হবে বলে মনে হয়না, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় যা করার দরকার তা করবে, মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম তোষণ বন্ধ হবে। জঙ্গী আস্তানা থাকবে না? মনে আছে বাংলাদেশের এমপি আনোয়ারুল আজিমকে বাংলাদেশী সন্ত্রাসীরা কলকাতায় এনে নিউটাউনে খুন করেছিলো? অর্থাৎ মমতার প্রশয়ে পশ্চিমবঙ্গ দুই-বাংলার সন্ত্রাসীদের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছিলো। বাংলাদেশের সাথে পুরো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পড়বে। চোরা চালান কমবে। বাংলাদেশের জন্যে সুখবর যে, তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর হবে। খারাপ খবর যে, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীরা ফেরত আসবে। অনেকে স্বেচ্ছায় ফিরে যাবে, অন্যরা পুশব্যাক। ইউনুস আমলে কয়েক হাজার পুশব্যাক হয়েছিলো, তখন বাংলাদেশের স্বৰাষ্ট্ৰ মন্ত্রণালয় বলেছিলো যে, আমাদের কিছু করার নেই, কারণ এরা বাংলাদেশী। ওঁরাও টিভিতে বলছিলো কোথায় তাদের বাড়ীঘর, কবে তারা গেছেন ইত্যাদি।

মমতা ব্যানার্জী মহিলাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন তাঁরা রাত ৮-টার পর বাইরে না যান, বিজেপি হয়তো প্রথমেই মহিলাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। বিজেপি ইতিমধ্যে বলেছে, তারা ৪টি শিল্পনগরী তৈরী করবে। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প আসবে, চাকুরীর সৃষ্টি হবে, পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরতে পারবেন। মমতার ১৫ বছরের জঞ্জাল বিজেপি পরিষ্কার করতে উদ্যোগী হবে? পশ্চিমবঙ্গ এতকাল তোষণ, চুরি, লুঙ্গিতন্ত্র বহাল ছিলো, বিজেপি হয়তো এথেকে মানুষকে মুক্তি দেবে। বিজেপি’র আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই, বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে হবে, বাংলা সংস্কৃতি বাঁচাতে হবে, সন্ত্রসীদের ৭-সিষ্টার দখলের স্বপ্ন তছনছ করে দিতে হবে। ২০১৬-তে বিজেপি মাত্র ৩টি আসন পেয়েছিলো, ২০২১-এ ৭৭, এবার ২০৮, বিস্ময়কর এ উত্থানের পেছনে দিলীপ ঘোষ ও শুভেন্দু অধিকারীর অবদান অপরিসীম। বিজেপি’র কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক, ধারণা করি বিজেপি’র ত্যাগী নেতারা এ বিষয়ে সচেষ্ট থাকবেন।

আমরা বাংলাদেশের হিন্দু, আমাদের ভোট ছিলোনা, কিন্তু ১০০% সমর্থন ছিলো বিজেপি’র প্রতি। বাংলাদেশের হিন্দু মমতার পতন চেয়েছে। মুসলমানের একটি বড় অংশ মমতার পক্ষে ছিলেন, কারণ মমতা ব্যানার্জী মুসলিম তোষণ করতেন। শেখ হাসিনা’র প্রতি শুভেন্দু অধিকারীর শ্রদ্ধা দেখে বাংলাদেশের মানুষ অভিভূত হয়েছে। মমতা আউট, বাংলাদেশের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে এবার ‘তিস্তা চুক্তি’ হবে। যাহোক, মমতার পতন অনিবার্য ছিলো, কারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলো। মমতার পতনের অনেকগুলো কারণ ছিলো, আমার ধারণায় এরমধ্যে প্রধান ৩টি কারণ হচ্ছে,

(১) মুসলিম তোষণ: মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় থাকতে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। তৃণমূলের গুণ্ডাবাহিনীর প্রায় পুরোটাই মুসলিম? সরকারী মদতে এঁরা মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে। হিন্দুরা এটি ভালভাবে নেয়নি। মুসলমানরা এককাট্টা মমতাকে ভোট দেয়, হিন্দুরা ভেবেছে আমরা কেন এককাট্টা হবোনা? হিন্দুরা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হয়নি, যেটুকু হয়েছে তা বিজেপি’র জয়ের জন্যে যথেষ্ট। এছাড়া এবার সামান্য কিছু মুসলিম ভোট তৃণমূলের বিপক্ষে গেছে, বিজেপি তা পায়নি, কংগ্রেস, সিপিএম বা অন্যরা পেয়েছে।

(২) ‘এসআইআর’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন), অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন প্রকৃত ভোটার নির্ণয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন। এটি পুরো ভারতে হয়েছে বা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জী এর ঘোর বিরোধিতা করেছেন। কেন? কারণ তিনি পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ স্টাইলে নির্বাচন করে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এজন্যে তাঁকে আদর করে ‘ভোটচোর’, চাকুরীচোর, শিল্পচোর, ফাইলচোর বলে থাকে। ‘এসআইআর’র ফলে প্রায় ৯০লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন, এরমধ্যে ৫০লক্ষই নাকি মৃতভোট? এগুলো মমতা’র ভোট! তদুপুরি সীমান্ত বন্ধের ফলে অনুপ্রবেশকারীরা ভোট দিতে পারেনি। মমতার গুন্ডাবাহিনী জালভোট দিতে পারেনি।

(৩) দুর্নীতি, আইনের শাসন, মমতার কথাবার্তা এমনকি হিন্দুদের হুমকি প্রদান, মানুষ এগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। এতকাল মমতার বিজয়ের দু’টি খুট ছিলো, মুসলিম ভোট ও লক্ষীর ভান্ডার ও অন্যান্য ভাতা। মমতা লক্ষিভাণ্ডারে ১৫শ’ রুপি দিতেন, বিজেপি ৩হাজার দেবে বলে ঘোষণা করেছে। মুসলিম ভোটের দিকে বিজেপি নজর দেয়নি, কারণ মুসলিম ভোট বিজেপি আশা করেনা, পায়ও না? এছাড়া হুমায়ূনের বাবরী মসজিদ, আরজিকর কান্ড, শিক্ষা চুরি, ফাইল চুরি, চাকুরী চুরি, মুর্শিদাবাদ ঘটনা, বিশেষত: তৃণমূলের মুসলিম গুন্ডা লেলিয়ে দেয়া মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে।

মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ধান্ধা করছেন, এটি নাটক, এতে তিনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। কারণ ভারতে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, প্রচন্ড শক্তিশালী। তাঁরা বারবার চেষ্টা করেছে পশ্চিমবঙ্গে সুষ্ঠূ নির্বাচন করতে, মমতা বাঁধা দিয়েছেন, এবার তাঁরা সকল ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করে দিয়ে একটি সুষ্ঠূ নির্বাচন করেছেন। মমতা কারচুপি করতে পারেননি। এজন্যে তিনি নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিমকোর্ট, বিজেপি, মোদী-অমিত শাহের ওপর বেজায় রাগ! মমতা রাস্তায় নামলে মানুষ পিটাবে। এই পরাজয়ের সাথে সাথে হয়তো মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটবে। তাঁর বয়স হয়েছে। ভাইপো জেলে গেলে তিনি আরো ভেঙ্গে পড়বেন। ধীরে ধীরে তৃণমূল একটি ছোট্ট আঞ্চলিক দলে পরিণত হবে? এ মুহূর্তে তিনি ‘পদত্যাগ করবেন না’ বলে যে নাটক করছেন এতে কোন সাংবিধানিক সংকট সৃষ্ট হবেনা। তিনি না সরলে রাজ্যপাল তাকে ‘ঘাড় ধরে’ বের করে দেবেন।

মমতা সম্মর্কে চমৎকার একটি কথা বলেছেন দিলীপ ঘোষ, তিনি বলেছেন, “মমতা হচ্ছে শাড়ি পড়া ট্রাম্প”। প্রথমবার পরাজয়ের পর ট্রাম্পও হোয়াইট হাউস ছাড়বেন না বলে হুমকি দিয়েছিলেন, সময়মত ঠিকই ছেড়ে দিয়েছেন। মমতা ব্যানার্জিও যথা সময়ে পদত্যাগ করে দেবেন। এখন একটু ‘নাটক’ করছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের এক শ্ৰেণীৰ মুসলমান মমতা ব্যানার্জিকে সামনে রেখে ‘বাংলাস্থান’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছিলেন। দিল্লি এতে প্রমাদ গুনে। নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠূ নির্বাচন করতে সচেষ্ট হয়। পশ্চিমবঙ্গবাসী জানে ‘ভোট চুরি’ করতে না পারলে মমতার পরাজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না? এবার তাই হয়েছে। চোরেরা বিদায় হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবার শান্তি ফিরে আসবে।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।