প্রচ্ছদ » কৃষি » বিস্তারিত
কাজুবাদাম চাষে নতুন দিগন্ত, সফলতার পথে রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র
২০২৬ মে ০৭ ১৯:১৪:২২
রিপন মারমা, রাঙ্গামাটি : পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী ঢালু জমিতে এখন ঝুলছে পাকা লাল ও কমলা রঙের কাজু আপেল। এক সময়ের আমদানিনির্ভর উচ্চমূল্যের ফসল কাজুবাদাম এখন দেশের মাটিতেই বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করছে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালীস্থ পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কাজুবাদাম চাষের গবেষণায় মিলেছে অভাবনীয় সাফল্য, যা পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে যাচ্ছে।
রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও স্থানীয় উৎস থেকে ১০০টি জামপ্লাজম সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছরের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর দেখা গেছে, এও রাই-০২৪, ০৩০ এবং ০৩৭—এই তিনটি লাইন বা জাতের ফলন ও গুণগত মান অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
এ বিষয়ে কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ মাহমুদুল হাসান জানান, এসব জাতের একেকটি কাজু আপেলের ওজন ৮০-৯০ গ্রাম এবং নাটের ওজন ৮-১০ গ্রাম পর্যন্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, "পার্বত্য অঞ্চলের মৃদু অম্লীয় মাটি (পিএইচ ৫.০-৬.০) কাজু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা সফলতার দ্বারপ্রান্তে আছি এবং শীঘ্রই কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের চারা বিতরণ করতে পারব।"
তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৫ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি রয়েছে। রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, "বর্তমানে মাত্র ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম চাষ হচ্ছে, যেখান থেকে উৎপাদন আসছে প্রায় ১৫০০ মেট্রিক টন। যদি ১ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি কাজু চাষের আওতায় আনা যায়, তবে দেশের বার্ষিক ৬০ হাজার টনের চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।"
গবেষকরা জানান, কাজুবাদামের গাছ রোপণের ৩ বছরের মধ্যেই ফল দেওয়া শুরু করে এবং ৯-১০ বছরের একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে ৮-১০ কেজি নাট পাওয়া সম্ভব। কাজুবাদাম শুধু খাবার হিসেবেই নয়, এর 'কাজু আপেল' থেকে জুস ও জেলি তৈরি করা যায় এবং উচ্ছিষ্ট অংশ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে থাকা আমিষ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম মস্তিষ্কের শক্তি বাড়াতে এবং ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ একসময় কঠিন মনে হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমানে এর সব আধুনিক যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া দেশে ইতিমধ্যে ১৪টি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হয়েছে, যা চাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
১৯৭৬ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণা কেন্দ্রটি এখন পাহাড়ের কৃষকদের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক স্বপ্নের সারথি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত জাতের সম্প্রসারণ ঘটলে কাজুবাদাম হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য।
(আরএম/এসপি/মে ০৭, ২০২৬)
