প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
পরিবেশ সুরক্ষায় নিষিদ্ধ পলিথিন বর্জনের অপরিহার্যতা ও আইন
২০২৬ মে ১৩ ১৭:২৫:১৪
ওয়াজেদুর রহামন কনক
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের অভিযাত্রায় পলিথিন শপিং ব্যাগের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বর্তমানে এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। মূলত কৃত্রিম পলিমার দিয়ে তৈরি এই অপচনশীল পদার্থটি মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ বিনষ্ট করার পাশাপাশি জলাশয়ের বাস্তুসংস্থান ও নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়া কেবল প্রকৃতি নয়, বরং মানবদেহেও জটিল রোগের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের মাধ্যমে এর উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করেছে।
নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগের পরিবেশগত অভিঘাত এবং এর আইনি কাঠামোর বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও পরিবেশ-বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার দাবি রাখে। সমকালীন বিশ্বে পলিমারজাত পণ্যের অবারিত ব্যবহার বাস্তুসংস্থানের জন্য এক মহাবিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা কেবল বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, বরং অনাগত ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। পলিথিন মূলত উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপাইলিন দ্বারা নির্মিত একটি কৃত্রিম পলিমার, যার আণবিক গঠন অত্যন্ত জটিল এবং প্রাকৃতিকভাবে বিয়োজন নিরোধক। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ পলিথিন ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে প্রায় চারশত থেকে পাঁচশত বছর সময় নিতে পারে। এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যা মাটির স্বাভাবিক শ্বসন প্রক্রিয়া এবং অণুজীবের কার্যক্রমকে স্তব্ধ করে দেয়। ফলে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জিং বা পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মরুপ্রক্রিয়া বা ভূমির অনুর্বরতাকে ত্বরান্বিত করে।
নগরায়ণ ও জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে পলিথিনের নেতিবাচক প্রভাব আরও ভয়াবহ। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় পয়ঃনিষ্কাশন প্রণালী হলো শহরের ফুসফুসের মতো, যা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পলিথিন অপচনশীল হওয়ায় এটি নর্দমা ও ড্রেনে স্তূপ আকারে জমা হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে স্বল্প বৃষ্টিপাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং নগর জীবন স্থবির হয়ে পড়ে। এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতা কেবল যাতায়াত কষ্ট বাড়ায় না, বরং এডিস মশার বংশবিস্তারসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়। অন্যদিকে, পলিথিন যখন বর্জ্য হিসেবে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন তা থেকে ডাইঅক্সিন এবং ফুরানের মতো অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। এই বিষাক্ত বায়বীয় উপাদানগুলো বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়ে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে প্রাণঘাতী ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের হরমোন নিঃসরণ প্রক্রিয়া এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব আজ বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ।
বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেমের বিচারে পলিথিন একটি নীরব ঘাতক। নদী, নালা ও সমুদ্রের পানিতে মিশে যাওয়া পলিথিন কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক জলজ প্রাণীরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এটি তাদের পরিপাকতন্ত্রে জমা হয়ে অকাল মৃত্যু ঘটায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে একসময় মানুষের পাতে ফিরে আসে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনে এই প্লাস্টিক দূষণকেই এককভাবে দায়ী করা হচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিশ্বজুড়ে পরিবেশ আন্দোলনের অগ্রপথিক হিসেবে ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৬ (ক) এই নিষেধাজ্ঞার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আইনি কাঠামোর অধীনে পলিথিনের উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
আইনগত কঠোরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার এই অপরাধকে কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক লঙ্ঘন হিসেবে দেখেনি, বরং পরিবেশগত সংহতি বিনষ্টের একটি বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। আইনের ১৫(১) ধারায় উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে যে দশ বছরের কারাদণ্ড বা দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, তা মূলত এই ক্ষতিকর শিল্পের মূল উৎপাটন করার একটি কৌশল। অন্যদিকে, খুচরা পর্যায়ে মজুদ ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও আর্থিক দণ্ড ও কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে, যা নীলফামারীর সাম্প্রতিক অভিযানের মতো মাঠ পর্যায়ের প্রয়োগে প্রতিফলিত হয়। তবে কেবল দণ্ডদানই এই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়; এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা এবং পাটের মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্পের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
বাস্তবতা হলো, আইন ও জনসচেতনতার মধ্যে যখন সমন্বয় ঘটে, তখনই রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত সফল হয়। অপরাধীকে কেবল শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাকে পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধ করা এবং সাধারণ মানুষকে নিষিদ্ধ পলিথিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করাই সচেনতার মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে যেখানে জমির সীমাবদ্ধতা চরম, সেখানে পলিথিন দূষণ মানে হলো নিজের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলা। সুতরাং পলিথিনমুক্ত সমাজ গঠন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি নাগরিক আন্দোলনে রূপান্তরের দাবি রাখে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পরিবেশগত সুরক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে পলিথিনের মতো কৃত্রিম ও ক্ষতিকর অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখা অপরিহার্য। সমকালীন জ্ঞানের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, পলিথিন বর্জন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং পৃথিবীর টিকে থাকার স্বার্থে এটি এখন একটি আবশ্যিক বাধ্যবাধকতা।
পলিথিন দূষণের ভয়াবহতা নিছক তাত্ত্বিক নয়, বরং পরিসংখ্যানগতভাবেও এটি শিউরে ওঠার মতো। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটিরও বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়, যার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পুনরুৎপাদন সম্ভব হয়; বাকি অংশ সরাসরি নালা, নদী ও মাটিতে মিশে যাচ্ছে। প্রতি বছর বিশ্বে উৎপাদিত প্রায় ৫০০ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগের একটি বিশাল অংশ সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর জলাবদ্ধতার প্রায় ৮০ শতাংশ কারণ হিসেবে ড্রেনে আটকে থাকা এই অপচনশীল পলিথিনকে দায়ী করা হয়। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ সামুদ্রিক জীব এবং ১০ লক্ষেরও বেশি পাখি মৃত্যুবরণ করছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
