প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
যুক্তরাষ্ট্রের গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা
২০২৬ মে ১৩ ১৭:৩৯:৩৯
আবদুল হামিদ মাহবুব
আমার প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। যদিও আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে সাংবাদিকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছি, তথাপি লেখালেখি ছাড়তে পারিনি। তাই ওই সময়ে প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম 'ইত্তেফাক'-এ। শিরোনাম ছিল 'উন্নত দেশের হালচাল'। সেই লেখা ছাপা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর। লেখার মূল বিষয় ছিল, গৃহহীন ও মাদকাসক্ত নেশাগ্রস্তদের কথা। সেই লেখা বেরোনোর পর বাঙালি কমিউনিটির কেউ কেউ আমাকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন। এবার এসে যখন ফেসবুক স্ক্রল করছি, সামনে আসলো ফিলাডেলফিয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য। তার সেই বক্তব্য থেকে এই সিটিতে হোমলেস ও নেশাগ্রস্ত মানুষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গেলাম। এই ডিজিটাল যুগে গুগল সার্চ করায় আরো কিছু তথ্য সামনে আসলো। তাই আবারও সেই একই বিষয় নিয়েই লিখছি।
চারদিন আগে দেওয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরটি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নগরীর রাজপথ, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা সেতুর নিচে বসবাসকারী মানুষদের উপস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি শহরের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি বড় নগর সংকট।
এই প্রেক্ষাপটে ফিলাডেলফিয়া সিটি কর্তৃপক্ষ হোটেল কক্ষের ওপর কর বৃদ্ধি করে সেই অর্থ গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ব্যয় করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি নগর প্রশাসনের সামাজিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ।
মেয়র প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ কোটি ডলার রাজস্ব আসবে। ২০০ ডলারের একটি হোটেল কক্ষের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪ ডলার কর দিতে হবে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, এই অর্থ দিয়ে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং রাস্তার মানুষের কাছে পৌঁছানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
ফিলাডেলফিয়ার বাস্তবতা বোঝার জন্য শহরটির সামগ্রিক চিত্র জানা জরুরি। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। শহরের আয়তন প্রায় ১৪২ বর্গমাইল বা ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার।
এই বিশাল নগরীতে রয়েছে লাখ লাখ আবাসিক ইউনিট। শহরের মোট হাউজিং ইউনিটের সংখ্যা প্রায় সাত লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ নিজেদের মালিকানাধীন ঘরে বসবাস করেন। বাকিরা ভাড়াটিয়া। তবে আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে।
ফিলাডেলফিয়ার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। “দ্য পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্টস এবং স্টেট অব দ্য সিটি টুয়েন্টি টোয়েন্টি-ফাইভ” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশই ছোট ব্যবসা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত শহরের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস।
কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শহরে বৈষম্যও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও ফিলাডেলফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র বড় শহর বলা হতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, তারপরও শহরের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন।
এই দারিদ্র্য, উচ্চ ভাড়া, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মিলেই গৃহহীনতার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০–এর বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও বাকিরা এখনো রাজপথে, অস্থায়ী তাঁবুতে বা অনিরাপদ স্থানে জীবন কাটাচ্ছেন।
ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটন এলাকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত। মাদক সংকট, বেকারত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন মানুষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই অভিযোগ করেন; রাস্তায় মাদক সেবন, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়; প্রয়োজন স্থায়ী পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা সহায়তা।
এখানেই সিটি প্রশাসনের নতুন করনীতির গুরুত্ব। শহর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পর্যটন খাত থেকে সামান্য অতিরিক্ত কর নিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা হলে পুরো নগরই লাভবান হবে। কারণ গৃহহীনতা কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে এই নীতির সমালোচনাও রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, অতিরিক্ত হোটেল কর পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পর্যটকরা অন্য শহর বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি কিংবা বোস্টনের মতো শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা ফিলাডেলফিয়ার জন্য এটি একটি ঝুঁকি।
কিন্তু পাল্টা যুক্তিও শক্তিশালী। যদি অতিরিক্ত ৪ ডলার কর দিয়ে রাজপথে বসবাসকারী একজন মানুষকে আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শহরের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে। কারণ গৃহহীনতা কমলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; গৃহহীনতা শুধু বাসস্থান না থাকা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরি হারানো, আসক্তি কিংবা স্বাস্থ্য সংকটের ফল। ফলে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগরনীতি।
ফিলাডেলফিয়া প্রশাসন বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রের শয্যা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। মেয়র শেরেল পার্কার প্রশাসন ইতোমধ্যে নতুন রিকভারি সেন্টার চালু করেছে, যেখানে শতাধিক মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে।
বিশ্বের বড় শহরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, গৃহহীনতা মোকাবিলায় 'আগে বাসস্থান' নীতি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষকে আগে নিরাপদ বাসস্থানে নিয়ে আসতে হবে; এরপর তার চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি সেই পথেই একটি পদক্ষেপ হতে পারে। যদিও এটি পুরো সমস্যার সমাধান নয়, তবে নগর প্রশাসনের একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে; রাজপথে মানুষ পড়ে থাকবে আর শহর চোখ বন্ধ করে থাকবে, সেই সময় শেষ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের নগরীগুলোর জন্যও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটেও গৃহহীন ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় বিষয়টি দান-খয়রাত বা মৌসুমি শীতবস্ত্র বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থান অন্তর্ভুক্ত হয় না।
ফিলাডেলফিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, একটি শহর যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে তাকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভেতরেও সামাজিক ন্যায়বিচারের জায়গা তৈরি করতে হবে। শহরের হোটেল, ব্যবসা, পর্যটন এবং উন্নয়ন; সবকিছু তখনই অর্থবহ, যখন সেই শহরে কোনো মানুষকে ফুটপাথে রাত কাটাতে না হয়।
পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগরী শুধু উন্নত অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; বরং এটি তৈরি হয় নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আর সেই কারণেই ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগর সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
