ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

বাড়ি বিক্রি করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবাননে, ফিরিয়ে আনতে হবে লাশ!

২০২৬ মে ১৩ ১৯:৩৭:৩৯
বাড়ি বিক্রি করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন লেবাননে, ফিরিয়ে আনতে হবে লাশ!

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর গ্রামের সুরঞ্জন দাস ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিন ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার অভাবের সংসার। বড় ছেলে শান্তি দাস বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করে। মেঝ ছেলে শুভ দাস কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে ট্রলি চালাতো। একমাত্র মেয়ে সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বাালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। ছোট ছেলে সুদীপ দাস পড়ে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্ত্রী শিখা দাস একজন গৃহিনী। তাই সংসারের বিরাট খরচ বহন করতে না পেরে মেঝ ছেলে শুভকে তিন বছর আগে লেবাননে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে শুভ মাইফাদুন এলাকায় একটি বাড়ি দেখাশুনা ও বাড়ি সংলগ্ন বাগানে কাজ করতো।

শেষ সম্বল মাত্র এক শতক জমির উপর শেষ আশ্রয়স্থলটি বিক্রি করে আরো চার লাখ টাকা সমিতি ও স্থানীয়দের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে শুভকে লেবাননে পাঠান সুরঞ্জন দাস। বাড়ি বিক্রির পর একই গ্রামে এক হাজার টাকার ভাড়া বাসায় বসবাস করেন সুরঞ্জন দাস (৫৫)। প্রতি মাসে শুভ’র পাঠানো ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে ঋণ শোধের পাশাপাশি ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা ও সংসার খরচ চালানো হতো। শেষের দুই মাস টাকা পাঠায়নি শুভ। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের সময় ইজরাইলি ড্রোন হামলায় শুভ মারা যায়। একই সময়ে বাংলাদেশের আরো দুইজন মারা যায়। তবে তারা সাতক্ষীরার বাসিন্দা নন।

আজ বুধবার সকালে শ্রীপতিপুর গ্রামে গেলে দেখা গেছে শুভ’র বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যরা লাশ ফিরে পাওয়ার জন্য প্রহর গুনছেন।

সাধনা দাস জানায়, মঙ্গলবার দুপুরে মুঠোফোনে তার দাদার মৃত্যুর খবর পান তারা। রবিবার রাতে তাদের সঙ্গে দাদার শেষ কথা হয়। দুই মাস টাকা পাঠাতে না পারার জন্য কষ্ট পাচ্ছিল সে। আয়ক্ষম দাদার অকাল মৃত্যুতে তাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। হয়তো তার ও ছোট ভাইয়ের আর পড়াশুনা করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া বাবা বকেয়া ঋণের টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেছে।

শিখা রানী দাস জানান, সংসারের হাল ফেরাতে যেয়ে বিয়ে না করেই লেবাননে যায় শুভ। ভেবেছিলেন আরো কিছু দিন লেবাননে থাকার পর দেশে নিয়ে এসে শুভকে বিয়ে দেবেন। ভগবান বুঝি তাদের সুখ সহ্য করতে পারলেন না। তাই এভাবেই কেড়ে নিলেন তার ছেলে শুভকে। তার ছেলের লাশ যাতে দ্রুত ফিরে পান সেজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবেন।

শুভ’র বাবা সুরঞ্জন দাস বলেন, ঈশ্বর যেন তাকে ছেলের শোক সহ্য করার ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেন। নইলে অন্যের বাড়িতে ভাড়া থেকে সংসার চালাবেন কিভাবে?

শ্রীপতিপুর গ্রামের সুমন দাস বলেন, শুভ খুব ভাল চেলে ছিলো। কারো সাথে বিরোধ করতো না। ঈশ্বর যেন তাকে স্বর্গবাসী করে।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, শুভ’র পরিবার যাতে দ্রুত লাশ ফিরে পেতে পারে সেজন্য তারা সার্বিক চেষ্টা চালাবেন। একইসাথে সরকারি সব ধরণের সহায়তা পাওয়ার জন্য তারা উদ্যোগ নেবেন।

প্রসঙ্গত, এ নিয়ে রবিবার ও সোমবার লেবাননে কর্মরত সাতক্ষীরা জেলার তিনজন রেমিটেন্স যোদ্ধার ইজরাইলি ড্রোন হামলায় মৃত্যু হলো।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানান, শুভসহ তিনজনের লাশ লেবানন থেকে ফেরানোর জন্য চেষ্টা চলছে।

(আরকে/এসপি/মে ১৩, ২০২৬)