প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপপুর
২০২৬ মে ১৬ ১৮:১২:০৪
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : বাংলাদেশ এখন সময়ের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও বহু স্বপ্নের বাস্তব রূপ হিসেবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, গত ১২ মে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে সফলভাবে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত বিদ্যুৎ উৎপাদন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরঘেঁষা সবুজ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল নতুন এক যুগের সূচনার জন্য। গত ২৮ এপ্রিল রিঅ্যাক্টরের কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশের মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। এর সঙ্গে জেগে উঠেছে দেশের জ্বালানি খাতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের প্রতীক। পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
দুটি ইউনিট নিয়ে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। পুরো প্রকল্প চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নির্মাণকাজে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কাজ করছেন প্রকল্প এলাকায়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে এবং সেপ্টেম্বরে দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে এটি হবে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি বড় উৎস।
এদিকে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ গত বছরের মে মাসেই সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পিজিসিবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হবে।
বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বিশ্বে এটি এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপপুর আজ শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং আত্মনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
(এসকেকে/এসপি/মে ১৬, ২০২৬)
