প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
আলিম সিন্ডিকেটের কবলে জেগে ওঠা চর
পদ্মা সেতু সংলগ্ন লৌহজংয়ে মাটি লুটের মহোৎসব
২০২৬ মে ১৬ ১৮:৫২:০১মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ : পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের পদ্মা নদীতে আবারও অবৈধ বালু কাটার মহোৎসব চলছে। রাতের আঁধারে পদ্মা নদীর জেগে ওঠা নতুন চর থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে ব্যাপক হারে মাটি কাটছে শিবচর-কাঁঠালবাড়ির প্রভাবশালী একটি বালু সিন্ডিকেট চক্র। এতে একদিকে যেমন পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ফিরে পাওয়ার স্বপ্নে বুক বাঁধা কয়েক হাজার ভূমিহীন মানুষের আশা ধূলিসাৎ হতে চলেছে। নৌ-পুলিশের নদীর সীমানার অজুহাত ও মোটা অঙ্কের মসোহারার কারণেই সিন্ডিকেট চক্রটি নদীতে বালু ও মাটি কাটার সুযোগ করে নিচ্ছে। রীতিমত পাহারা বসিয়ে সেখানে বালু উত্তোলন চলছে। উপজেলা প্রশাসন সেখানে অভিযান চালালেও প্রশাসনের মধ্যে সিন্ডিকেটের মসোহারা ভুক্ত লোক থাকায় অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যাচ্ছে চক্রটি। তাইতো গত সোমবার রাতে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা ফারজানা ববি মিতু একটি অভিযান পরিচালনা করলেও তা বিফল হয়। শুক্রবার রাতে অভিযানে ২টি ড্রেজার বিকল করা হলেও অভিযানের খবর লিক হয়ে যাওয়ায় সিন্ডিকেট চক্রটি ফ্রেজার ফেলে চলে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাঁঠালবাড়ির আলিম শেখের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বালু সিন্ডিকেট চক্র অন্তত ছয়টি বড় লোড ড্রেজার দিয়ে প্রতি রাতে কয়েক লাখ টাকার মাটি লুট করছে। এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় ড্রেজার মালিকরা হলেন আলিম শেখ, মান্নান খান, চুন্নু বেপারী, বকুল ঢালী ও আতাহার বেপারী সহ আরো কয়েকজন। মাটি কাটায় ব্যবহৃত ড্রেজারগুলোর মধ্যে রয়েছে-মোয়াজ লোড ড্রেজার, তৌসিন সিফাত, বেপারী ড্রেজার, কাঁঠালবাড়ি লোড ড্রেজার, ভাই ভাই লোড ড্রেজার ও আহাদ আব্দুল্লাহ লোড ড্রেজার। তবে এ সিন্ডিকট চক্রের সাথে যোগ করে বক্তব্য নিতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি।
নৌ-পুলিশের ‘সীমানা’ অজুহাত ও মাসোহারা অভিযোগ
নদীর সীমানা নির্ধারণের জটিলতা দেখিয়ে নৌ পুলিশ একে অপরের ঘারে চাপিয়ে দিয়ে পার পাবার চেষ্টা করছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে এই সিন্ডিকেট চক্রের তেকে নিয়মিত চাঁদা নেবার অভিযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতুর ১৪ থেকে ১৭ নম্বর পিলালের পশ্চিমে কোস্ট গার্ড অফিস সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন গভীর রাতে চলে এই বালু মাটি কাটার তৎপরতা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি ড্রেজার থেকে দৈনিক ১৭,৫০০ টাকা করে ‘চাদা’ নিচ্ছে কাঁঠালবাড়ি নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির একটি অংশ। অভিযোগের তীর ফাঁড়ির ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম ও টু-আইসি এসআই আবুল বাশারের দিকে। তবে শহিদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ১৭ নম্বর পিলারের পরের অংশ আমাদের সীমানায় পড়ে না। এটি লৌহজংয়ের অংশ। তাই সেখানে কিছু হলে দায় দায়িত্ব আমাদের না।
অন্যদিকে মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির আইসি মো. ইলিয়াস জানিয়েছে আমাদের লৌহজং এলাকায় এখন কেউ বালু কাটছেনা। আমরা সজাগ রয়েছি। তবে কাঠালবাড়ি এলাকায় কেউ কেউ বালু কাটছে বলে শুনেছি। আমার ফাঁড়ির কেউ চাদাবাজির সাথে জড়িত নয়। এ ধরণের অপকর্মে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দুই পাড়ের নৌ পুলিশের এই ‘ঠেলাঠেলি’র সুযোগেই নির্বিঘেœ চলছে বালুদস্যুতা। এমনকি কোস্টগার্ডের গতিবিধি নজরদারি করতে বালুদস্যুরা মাওয়া কোস্টগার্ড অফিসের সামনে নিয়মিত পাহারাদার বসিয়ে রাখে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অস্ত্রধারী বাহিনী ও তথ্য পাচারের অভিযোগ
স্থানীয়রা জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত ভয়ংকর। অভিযানে আসার আগেই প্রশাসনের তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তারা দ্রুত সীমানা পরিবর্তন করে সটকে পড়ে। ড্রোর পাহারা দিতে প্রতি রাতে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে একটি সশস্ত্র ডাকাত দল নিয়োজিত থাকে।
১০-১২ জন লোক নিয়ে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে তারা লৌহজং সীমান্তে মহড়া দেয়। এলাকাবাসী বাধা দিতে আসলে সেখানে রক্ত ক্ষয়ি যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকে এবং তাদের ওপর অস্ত্রের মুখে হামলা চালানোর হুমকি দেওয়া হয়।
এর আগেও লৌহজংয়ের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নেছার উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সফল অভিযানে দুটি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছিল। এরপর প্রায় বছর খানি অবৈধ ড্রেজার বন্ধ থাকলেও চক্রটি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অভিযানের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ দ্যুরা কৌশলে ‘চোর-পুলিশ’ খেলছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ইতিমধ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের দাবি, "এই চর আমাদের অস্তিত্ব। বছরের পর বছর নদী ভাঙনে আমরা সব হারিয়েছি, এখন চর জেগে ওঠায় আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু ড্রেজার সিন্ডিকেট আমাদের ভিটেমাটি গিলে খাচ্ছে।"
খুব দ্রুতই বড় ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পদ্মা সেতুর সংলগ্ন এলাকায় এমন অবৈধ মাটি উত্তোলন সেতুর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এলাকাবাসীর দাবি, শুধু জরিমানা নয়, এই সিন্ডিকেট ও তাদের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা হোক।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে পদ্মায় অভিযান চালিয়ে ২টি ড্রেজার বিকল করে দেয়া হয়েছে। কোষ্টগার্ড নিয়ে অভিযান পরিচালনার সময় খবর পেয়ে ড্রেজারের চালকরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। যদি আমার প্রশাসনের কেউ ড্রেজার মালিক চালকদের সাথে জোগসাজস করে কোন সুবিধা নিয়ে থাকে তবে প্রমান পেলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
(এমকে/এসপি/মে ১৬, ২০২৬)
