প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বইমেলার জৌলস বাড়াবে?
২০২৬ মে ২১ ১৮:০১:৫৯
শিতাংশু গুহ
সৈয়দ মুজতবা আলি’র বিখ্যাত উক্তি, ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়না’ মনে পড়লে হাঁসি পায়, বাঙ্গালী কি আসলে বই কিনে? বই কিনে কোন বাঙ্গালী দেউলিয়া হয়েছে এমন তথ্য আমার জানা নেই! বাঙ্গালীর কি বই পড়ার বদভ্যাস আছে? একদা আমি যখন নিউইয়র্কে সাবওয়েতে চলাচল করতাম তখন অবাক হয়ে দেখতাম, অনেকের হাতেই বই, এমন দৃশ্য ঢাকায় দেখেছি বলে মনে পড়েনা। ওপার বাংলায় অবশ্য আগে পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি দেখেছি, বাংলাদেশে তা দেখিনি। আমি চাঁদপুরের ছেলে, আমাদের ছোটবেলায় জোড়পুকুর পাড়ে ‘পাকিস্তান লাইব্রেরি’ নামে একটি লাইব্রেরি ছিলো, যা স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ লাইব্রেরি’ হয়ে যায়, আমরা সেখানে আড্ডা মারতাম, কারণ দোকানটি ছিলো আমাদের এক বন্ধু’র বাবার। সেই সুবাদে আমাদের কিছু বই পড়া হতো। ওই পাঠাগারে একটি ফ্ল্যায়ার প্রায়শ: আসতো, তাতে লেখা থাকতো, ‘যাঁরা লাইব্রেরি ব্যবসা করে তাঁরা মহান’। আসলে কি তাই? ঢালাও ভাবে এমন কথা কি বলা যায়?
এসব ভণিতার অর্থ হচ্ছে, নিউইয়র্কে বইমেলা এসে গেছে, এটি পঁয়ত্রিশ-তম। দেখতে দেখতে এত বছর পেরিয়ে গেছে। আমার সৌভাগ্য এ বইমেলায় প্রথম থেকেই আমি একজন দর্শক-অনুরাগী হিসাবে উপস্থিত থাকি, বা থাকার চেষ্টা করি। ঢাকাতে যখন বইমেলা শুরু হয় তখন আমি ঢাকা ভার্সিটি’র ছাত্র, কিন্তু প্রথম বইমেলায় উপস্থিত ছিলাম বা তাতে আমার কোন আগ্রহ ছিলো তা মনে হয়না। বয়সের একটা ব্যাপার থাকে, তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত পানসে লাগতো। বরং নজরুলের ‘মোর প্রিয়া হবে এস রানী’ ভাল লাগতো। ঢাকার বইমেলা যেমন ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়, নিউইয়র্কে মুক্তধারার বইমেলাও তেমনি বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়। ঢাকা বা কলকাতার পর বহির্বিশ্বে এতবড় সাহিত্য আয়োজনকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই? ২০২৪-এ তথাকথিত বিপ্লবের পর ঢাকায় বইমেলায় মৌলবাদের ছোবল পড়ে, ২০২৬-এ তো হচ্ছেনা, হচ্ছেনা করে শেষদিকে কোনরকমে একটি সংক্ষিপ্ত ‘জগাখিচুড়ি’ জৌলুসহীন বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
এর কিছুটা আঁচ নিউইয়র্কেও লাগে। এমন ঝড় অবশ্য নুতন নয়, আগেও ক’বার এমনটা হয়েছে, তাতে মূল বইমেলার তেমন ক্ষতি হয়নি। ‘শত ফুল ফুটতে দাও’ বলে একটি কথা আছে, একাধিক বইমেলা ভাল, তাতে যদি বই বিক্রী বাড়ে, নুতন নুতন প্রতিভার সৃষ্টি হয়, তাহলে মন্দ কি? শুধু রেষারেষি না থাকলেই হলো। মুক্তধারার বইমেলা প্রবাসে প্রচুর লেখক, সাহিত্যিক, পাঠক সৃষ্টি করেছে তা বলা বাহুল্য। এ মেলা দেশ-প্রবাস এবং লেখক-পাঠকের মধ্যে একটি যোগসূত্র গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে তা স্বীকার্য। বইমেলা মুক্তমনা মানুষের মেলাবন্ধনকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অধুনা ‘কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা’ (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এআই)-র যুগে লেখক, কবি, সাহিত্যিক চাকুরী হারাবেন কিনা বলা শক্ত, তবে ‘এআই’ সামনের দিনগুলোতে যেকোন বইমেলায় অপরিহার্য হয়ে উঠবে। দেশে বা প্রবাসে আমাদের এনালগ বইমেলা হয়তো ধীরে ধীরে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করবে।
দেশের বা প্রবাসের মুক্তধারার বইমেলার ভবিষ্যৎ কি? বইকে ভালবাসে এমন মানুষ কি বাংলাদেশে খুব বেশি আছে? দেশে কেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লাইব্রেরি নেই? ওমর খৈয়ামের বিখ্যাত উক্তি, ‘প্রিয়ার কালোচোঁখ ঘোলা হয়ে আসবে, কিন্তু বই অনন্তযৌবনা,...’র কোন মূল্য কি আছে আমাদের মৌলবাদী সমাজে? এ সমাজে ‘বইমেলার’ ভবিষ্যৎ কি খুব একটা উজ্জ্বল মনে হয়? একটি গল্প বলি, গল্প না সত্যি ঘটনা। ঢাকায় ‘ইত্তেহাদ’ নামে একটি সাপ্তাহিক ছিলো, এর প্রচার সংখ্যা বিশাল, কারণ পত্রিকাটি আগাগোড়া ‘সাম্প্রয়দায়িক ও কট্টর ভারত বিরোধী’। আমাদের এক বন্ধু রেজাউল হক সরোজ ঐ পত্রিকায় কাজ করতো। সরোজ খবর পেলো যে, ভারত থেকে প্রচুর বই চোরাচালান হয়ে এসেছে, তিনি মালিক-সম্পাদক অলি আহাদ-কে জানালেন। অলি আহাদ রিপোর্টটি ছাপালেন না, বললেন, বই আসতে দাও, বই ভাল জিনিষ।
বই যে ভাল জিনিষ তা কি আজকের বাঙ্গালীর মাথায় আছে? বই যদি ভাল হয়, বইমেলাও ভাল। তা সেটি নিউইয়র্ক, ঢাকা, কলকাতা যেখানেই হোক। ৩৫তম বইমেলা সফল হউক, সার্থক হউক। বাঙ্গালী বই কিনুক, বই পড়ুক, বই উপহার দিক। বই হোক নিত্যসঙ্গী। দেখা হবে বই মেলায়।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।
