প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
হাসপাতাল ডুবিয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত তত্ত্বাবধায়ক মোহসীন
২০২৬ মে ২১ ১৮:৩৫:৫৫
বিশেষ প্রতিনিধি : মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, যেখানে জেলার ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল। তবে সেই সরকারি হাসপাতালই যখন দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয় তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। এমনই এক চিত্র ফুটে উঠেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, হাসপতালের তত্তাবধায়ক মোহসীন উদ্দিন নিজের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে পুরো হাসপাতাল ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩ মার্চ ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা থেকে মোহসীন উদ্দিন মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক পদে যোগদান করেন। এরপর উচ্চমান সহকারী ফারজানা হক, রের্কড কিপার তরিকুল ইসলাম ও ওয়ার্ডবয় নূর আলমকে নিয়ে একটি শত্তিশালী চক্র তুলে ধরে। তত্ত্বাবধায়ক যোগদানের পর থেকে একর পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি চলতে থাকে হাসপাতালটিতে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, হাসপাতালটিতে মোট ৭৯ জন চিকিৎসকরে বিপীরতে বর্তমানে চিকিসক রয়েছে মাত্র ২৬ জন। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ৫ জন। এছাড়াও নার্স, আয়া ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে যে জনবল আছে তা হাসপতালের তুলনায় খুবই কম।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত অব্যবস্থাপনার ছাপ স্পষ্ট। প্রয়োজনীয় চিকৎসা সরঞ্জামের সংকট, ওষুধের ঘাটতি, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি সব মিলিয়ে রোগীদের দূর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অথচ কাগজে-কলমে এ হাসপাতালের জন্য প্রতিদিনের বরাদ্দ থেমে নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তত্ত্বাবধায়ক মোহসিন উদ্দিন মাগুরা হাসপাতালে যোগদান করার পর থেকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপির আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নিজেও পাল্টে যান বেশ। তখন তিনি স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে চলতে থাকেন। এরপর হাসপাতালের কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মচারী-কর্মকর্তাদের নিয়ে গোড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যে সিন্ডিকেট সরকারি ওষুধ বিক্রি করে থেকে শুরু করে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়াসহ সকল কিছু করে থাকে। সম্প্রতি হাসপাতালে এমএসআর সামগ্রী ক্রয়ের জন্য হাসপাতালে ৫ কোটি টাকার বরাদ্দ আসে। সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে পছন্দের এক ঠিকাদারকে নিয়োগ দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক। গত বছরেও কেনাকাটার জন্য নিয়োগকৃত ঠিকাদারের কাছ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করছেল তত্ত্বাবধায়ক মোহসীন। এছাড়াও খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদার, হাসপাতালের আশপাশে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন। সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও স্যানিটেশন সংস্কার কাজের জন্য ২৬ লাখ টাকার বরাদ্দ আসে। তবে ওই মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে জানা যায়, সংস্কারের কাজের টাকা ঠিকাদার ও তত্ত্ববধায়ক দুজনে মিলে তুলে লিয়েছেন।
সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক মোহসীনের অনিয়ম-দুর্নীতির সকল কাজ দেখাশোনো করে ওয়ার্ড মাস্টার নুর আলম ও রের্কড কিপার রফিকুল ইসলাম। সরকারি হাসপাতালের ওষুধ বিক্রি ও প্রাইভেট-ক্লিনিকের কমশিন বাণিজ্য দেখাশোনা করে এই দুই ব্যক্তি। ওয়ার্ড মাস্টার নুর আলম হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত ২৫ ব্যক্তির কাছ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছে। যা খোদ তত্ত্বাবধায়ক জানলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি তাকে ওয়ার্ডবয় থেকে ওয়ার্ড মাস্টার পদে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির টাকায় রাজধানী ঢাকাতে নিজের স্ত্রী ও সন্তানের নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন মোহসীন উদ্দিন।
এদিকে, গত তিন বছর ধরে হাসপাতালটি একমাত্র সিজারিয়ার অপারেশন ছাড়া অন্য কোনো অপারেশেন হচ্ছে না। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনেরা বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী ফরিদপুরসহ অন্যান্য জায়গায় গিয়ে অপারেশন করাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক স্যার যেটা করবে সোই নিয়ম। তিনি যদি অনিয়মও করেন তার প্রতিবাদ করা যাবে না। প্রতিবাদ করলেই বদলিসহ শাস্তি হবে। তার কারণে এ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসে এখানে থাকতে চান না। সব সময় স্টাফদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন।’
শহরতলীর নিজ নান্দুয়ালি থেকে চিকিৎসা নিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ঘুরছি ডাক্তার দেখানোর জন্য। তবে এখানে এসে শুনছি ডাক্তার নেই। আমাদের মত গরীব মানুষের বাইরের চেম্বারে টাকা দিয়ে ডাক্তার দেখানোর অবস্থা নেই।’
মাগুরা নাগরিক কমিটির সভাপতি এটিএম মহব্বত আলী বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় অনৈক তত্ত্বাবধায়ক এই হাসপাতালে এসেচে। তবে মোহসীন আলীর মত নিকৃষ্ট ব্যক্তি আর দ্বিতীয়টি দেখি নাই। একটা সময় এই হাসটপাতালের অনেক সুনাম ছিল। তবে মোহসীন উদ্দিন যোগদান করার পর তার অনিয়ম-দুর্নীতিতে হাসপাতালের সুনাম নষ্ট হয়ে গেছে। অচিরেই দুর্নীতিবাজ এই কর্মকতাকে বদলি করে হাসপাতালের পুরানো সুনাম ফিরিয়ে অঅনতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করছি।’
অভিযোগের বিষয়ে মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্তাবধায়ক মোহসীন উদ্দিন বলেন, ‘একটা গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। আমি মআমার কাজগুলো ঠিকমত করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এই চেয়ারে বসলেই আয়-ইনকাম হবে এটাতো দোষের কিছু না। যারা এই চেয়ারে বসে দায়িত্ব পালন করছেন তাঁরা প্রত্যেকে এমনই। আপনার শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করছেন।’
এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন ডা. শামীম কবির বলেন, ‘হাসপাতালের সবকিছুই তিনি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাই তিনি যদি অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন সেখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে এর আগে একবার তত্ত্বাবধায়কের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আমাদের কাছে একজন লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল। অদৃশ্য কারণে সেটার তদন্ত করা তখন সম্ভব হয়নি।’
(একে/এসপি/মে ২১, ২০২৬)
