প্রচ্ছদ » দেশের বাইরে » বিস্তারিত
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘে জলবায়ু প্রস্তাব পাস
২০২৬ মে ২২ ১৪:০১:৩২
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায় স্বীকার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সাম্প্রতিক পরামর্শমূলক মতামতের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আনা এ প্রস্তাব ১৪১-৮ ভোটে গৃহীত হয়।
তবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছে।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর সুস্পষ্ট আইনি দায়িত্ব রয়েছে। আইসিজে তাদের ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দেওয়া পরামর্শমূলক মতামতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেয়।
যদিও আইসিজের এই মতামত আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এটি ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন জলবায়ু মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। অনেক বিচারকও রায়ে এ মতামতের উল্লেখ করছেন।
তবে বিষয়টি কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ইউএনএফসিসিসি জলবায়ু আলোচনায় বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। সৌদি আরব চূড়ান্ত নথিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করাকে “লাল রেখা” বলেও উল্লেখ করেছিল।
বুধবারের ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, রাশিয়া, ইসরাইল, ইরান, ইয়েমেন, লাইবেরিয়া ও বেলারুশ প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ ১৪১টি দেশ পক্ষে অবস্থান নেয়। ভারত, তুরস্ক, কাতার ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
ভোটের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং জলবায়ু সংকট থেকে মানুষকে রক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের শক্তিশালী স্বীকৃতি।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ একাধিক পরিবেশবিষয়ক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে।
জাতিসংঘে মার্কিন উপরাষ্ট্রদূত ট্যামি ব্রুস বলেন, প্রস্তাবটিতে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে “অনুপযুক্ত রাজনৈতিক দাবি” রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে মহাসচিবকে নতুন প্রতিবেদন দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা ওয়াশিংটন দেখছে না।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছিল, প্রস্তাবটি ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসন কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছিল।
ভোটের আগে জাতিসংঘে ভানুয়াতুর রাষ্ট্রদূত ওদো তেভি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বাস্তবতা। খরা, ফসলহানি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বহু দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল ইতোমধ্যে হুমকির মুখে পড়েছে।
ভানুয়াতুর জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী রালফ রেগেনভানু বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং জলবায়ু সংকটও এর বাইরে নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। তুভালুর গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ মিটার। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২১০০ সালের মধ্যে দেশটির অধিকাংশ এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় দেশটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ জলবায়ু অভিবাসন ভিসার জন্য আবেদন করেছেন।
অন্যদিকে, নাউরু সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতে জনগণকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার তহবিল গঠনে ধনী বিদেশিদের কাছে পাসপোর্ট বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। নাউরুর নাগরিকত্ব কিনে অনেক বিদেশি বিভিন্ন দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন।
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। “ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ টু স্টে অ্যালাইভ” স্লোগানটি সেখান থেকেই জনপ্রিয় হয়। তবে বিজ্ঞানীরা এখন সতর্ক করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
(ওএস/এএস/মে ২২, ২০২৬)
