ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

বিপদের সময় ধৈর্য, সবচেয়ে বড় শক্তি

২০২৬ মে ২২ ১৭:৫৩:১৫
বিপদের সময় ধৈর্য, সবচেয়ে বড় শক্তি

আবদুল হামিদ মাহবুব


৪ মে ২০২৬ আমরা ছেলে ও বউমাকে দেখতে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (জেএফকে) বিমানবন্দরে নেমে সেখান থেকে পেন্সিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়াতে ছেলের বাসায় উঠি। কতদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়েছি, সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যদিও দেড় বছর আগে একবার গিয়েছিলাম। সেসময় নভেম্বর মাস ছিল। ঠান্ডার সময় ঘরের ভেতর জমে থাকা অবস্থায় মধ্যে। তার মাঝেও মাঝে মধ্যে বেরিয়েছি। কিছু কিছু আমি ঘুরে দেখেছি। এবার গিয়ে আবার মনে হলো এতো নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন জীবনযাত্রা। সবকিছুই আমাদের কাছে ছিল বিস্ময়ের মতো। দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর আল্লাহর ইচ্ছা থাকে আরেক।

আমাদের ফেরার কথা ছিল ১৭ মে। ফ্লাইটের রুট ছিল ফিলাডেলফিয়া থেকে দোহা, তারপর দোহা হয়ে ঢাকা। আগের দিন রাতেই সব গুছিয়ে রেখেছিলাম। লাগেজ, কাগজপত্র, পাসপোর্ট; সব প্রস্তুত। কারণ বিদেশের যাত্রায় একটু অসাবধানতা মানেই বড় বিপদ। তাই আমরা যথেষ্ট সতর্কই ছিলাম। ১৭ মে সকালে ঘুম থেকে উঠতেই ছেলে এসে বলল, 'আব্বা, মনে হয় তোমাদের ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে।' আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলাম না। বললাম, 'কি বলিস! এসব আবার হয় নাকি?'

সে মোবাইলে ফ্লাইট বিষয়ে সার্চ করা তথ্য দেখালো। সত্যিই ফ্লাইট ক্যানসেল। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার স্ত্রীর সরকারি চাকরি। ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। সময়মতো যোগদান করতে না পারলে সমস্যায় পড়তে পারেন। অথচ আমাদের হাতে কিছুই নেই। ছেলে আর বউমা সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাংলাদেশের যে এজেন্সি থেকে টিকিট কাটা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তারপর কাতার এয়ারওয়েজের আমেরিকার অফিসেও ফোন করতে লাগল। বাংলাদেশের এজেন্সির লোকজন স্পষ্ট কিছু বলতে পারছিল না। কখনো এক কথা, কখনো আরেক কথা। এতে ছেলের বিরক্তি আরও বাড়ল।

অনেক চেষ্টা করে অবশেষে কাতার এয়ারওয়েজের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হলো। তারা নিশ্চিত করল, ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অতিরিক্ত কোনো টাকা লাগবে না, কিন্তু সমস্যা হলো; জুলাইয়ের আগে ফিলাডেলফিয়া থেকে তাদের আর কোনো ফ্লাইট নেই।এই খবর শুনে আমরা সত্যিই দিশেহারা হয়ে পড়লাম। ঠিক তখনই বউমা একটি বুদ্ধি দিল। বলল,' ফিলাডেলফিয়া না হয়ে যদি নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দর থেকে টিকিট পাওয়া যায়?'

আমরা তাতেই রাজি হলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ১৮ মে রাত ১০টা ৫ মিনিটের একটি ফ্লাইটে টিকিট নিশ্চিত করা গেল। এবার নতুন সমস্যা। আমাদের লাগেজ অনেক। এতগুলো লাগেজ নিয়ে ফিলাডেলফিয়া থেকে নিউইয়র্ক যাব কীভাবে? উবারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ভাড়া প্রায় সাড়ে চারশো ডলার। আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, 'এত টাকা দিয়ে যাব? অন্য কোনো উপায় নেই?

অনেক আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হলো, বাসে করে নিউইয়র্ক যাওয়া হবে। তারপর সেখান থেকে উবারে বিমানবন্দর। বাসে করে আমরা নিউইয়র্ক পৌঁছালাম। বাস থেকে নামার পর আবার উবারের ভাড়া দেখা হলো। এবারও প্রায় আড়াইশো ডলার। আমি আবার আপত্তি করলাম। তখন বউমা মোবাইলে ম্যাপ দেখে বলল, 'পাঁচ মিনিট হাঁটলে সাবওয়ে স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন বদল করে জেএফকে যাওয়া যাবে।'

আমি হিসাব করে দেখলাম, এতে অন্তত দুইশো ডলার বাঁচবে। বললাম, 'সব লাগেজে তো চাকা আছে। একটু কষ্ট হবে, কিন্তু টাকা বাঁচবে। ছেলে আর বউমা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম, 'উবারে নয়, সাবওয়েতেই যাব। আমার স্ত্রীও বললেন, 'চলো, হাঁটাই শুরু করি।' আমরা লাগেজ টেনে টেনে সাবওয়ে স্টেশনের সামনে পৌঁছালাম। বউমা বলেছিল লিফট আছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি কোনো লিফটই নেই। আবার মোবাইলে খোঁজাখুঁজি। না, কোনো উপায় নেই। সিঁড়ি দিয়েই নামতে হবে। ছেলে বলল, 'তোমরা কেউ লাগেজ ধরো না। আমি নামাচ্ছি।' কিন্তু তার কথা কি আর শুনি! আমরা সবাই একেকটা লাগেজ ধরে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলাম। প্রথম ধাপেই হাঁপিয়ে উঠলাম। আমার পিঠে ছিল একটি ছোট ব্যাগ। তাতে পাসপোর্ট, টিকিট, জরুরি কাগজপত্র আর কিছু কাপড়চোপড়।

নিচে নেমে আমরা একটু বসে বিশ্রাম নিলাম। আমার স্ত্রী একটি বেঞ্চে বসলেন। আমিও পাশে বসলাম। পিঠের ব্যাগটি নামিয়ে পাশে রাখলাম। এদিকে কোন ট্রেন ধরতে হবে, সেটি নিয়ে আবার বিভ্রান্তি। কেউ একজন বলল নিচে যেতে হবে। আমরা লাগেজ নিয়ে আবার নিচে নামলাম। সেখানে গিয়েও ঠিকানা মেলেনি। এমন সময় অদ্ভুত সাজের এক লোক এসে সাহায্য করতে চাইল। সে বলল, আবার ওপরে উঠতে হবে। আমাদের লাগেজ দেখে সে নিজেই একটি ধরে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল। ছেলে বারবার বলছিল,'না না, লাগবে না।' কিন্তু লোকটি শুনল না। ছেলে আমাকে বলল, 'এরা সব সময় ভালো নাও হতে পারে। লাগেজ নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। আমি বললাম, 'তোমরা বাকিগুলো আনো। আমি লোকটার পেছনে যাচ্ছি।' আমি দৌড়ে তার পেছনে উঠলাম। লোকটি উপরে গিয়ে লাগেজ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। পরে আরও দুটো লাগেজ এনে দিল। শেষ পর্যন্ত সব লাগেজই সে সাহায্য করে তুলে দিল।

আমরা তাকে ধন্যবাদ দিলাম। ছেলে দশ ডলার বকশিশ দিল। লোকটি হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করে চলে গেল। ঠিক তখনই ট্রেন এসে গেল। আমরা তাড়াহুড়ো করে সব লাগেজ তুললাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। মিনিট খানেক পর বউমা হঠাৎ বলল, 'আব্বা, আপনার পিঠের ব্যাগ কোথায়?' আমার বুক ধক করে উঠল। বললাম, 'তোমাদের কারো কাছে তো দিয়েছিলাম!' তারা সবাই জানায় 'কেউ নেয়নি।' তখনই মনে পড়ল, বেঞ্চের পাশে রেখে এসেছি! মাথার ওপর যেন বজ্রপাত হলো। ওই ব্যাগেই ছিল পাসপোর্ট, টিকিট, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।

বউমা সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিল, পরের স্টেশনে নেমে ফিরে যেতে হবে। আমরা নেমে গেলাম। ছেলে হতাশ মুখে বলল, 'নিউইয়র্কে কিছু হারালে আর ফেরত পাওয়া যায় না।' কিন্তু বউমা হাল ছাড়ল না। সে বলল, সে ফিরে যাবে। আমি বললাম, 'তুমি একা যাবে না। আমিও যাব।' আমরা উল্টো দিকের ট্রেন ধরে আবার সেই স্টেশনে ফিরলাম। ট্রেন থেকে নেমেই বউমা দৌড় দিল বেঞ্চের দিকে। আর আশ্চর্য! ব্যাগটি ঠিক যেভাবে রেখেছিলাম, সেভাবেই পড়ে আছে। বউমা যেন চিলের মতো ঝাঁপিয়ে গিয়ে ব্যাগটি তুলে নিল।আমার বুকের ভেতর জমে থাকা পাথর নেমে গেল। আমি তার মাথায় হাত রেখে বললাম, 'মা, তুমি না থাকলে আজ বড় বিপদে পড়তাম।' তারপর ছেলেকে ফোন করে জানানো হলো ব্যাগ পাওয়া গেছে। ওর কণ্ঠে তখন স্বস্তি আর আবেগ একসঙ্গে।

আবার ট্রেনে চড়ে আমরা তাদের কাছে ফিরলাম। তারপর জেএফকে বিমানবন্দরের ট্রেন ধরলাম। সেই ট্রেন বিমানবন্দরের সব টার্মিনালে থামে।আমাদের নামতে হলো ৮ নম্বর টার্মিনালে।ততক্ষণে আমরা সবাই ক্লান্ত। খাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এত ঝামেলার মধ্যে কারো আর খাওয়ার কথা মনে নেই।

কাতার এয়ারওয়েজের কাউন্টারে পৌঁছে দেখি বোর্ডিং শুরু হয়ে গেছে। আমাদের চারজনের লাগেজের সীমা ছিল চারটি বড় ব্যাগ। কিন্তু একটি অতিরিক্ত হয়ে গেল। সেই ব্যাগের জন্য ৩২৫ ডলার অতিরিক্ত দিতে হলো। ছেলে নিজের কার্ড দিয়ে টাকা দিল। এরপর বিদায়ের সময় এলো।বিদেশে থাকা সন্তানকে বিদায় দেওয়া কত কঠিন, সেটা হয়তো ভাষায় বোঝানো যায় না। ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি শুধু বললাম,'ভালো থাকিস বাবা। তোরা ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকব।

তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।বউমার মাথায় হাত রেখে বললাম, 'তোমরা একে অন্যকে দেখে রেখো। বউমার চোখও ভিজে উঠেছিল। দোহা পর্যন্ত যাত্রা নির্বিঘ্নেই হলো। সেখানে ট্রানজিটের সময় খুব কম ছিল। তাই সবাই দৌড়ে দৌড়ে পরের বিমানের কাউন্টার হয়ে বিমানে উঠলাম। বিমানে উঠেই বুঝলাম, এবার নিজের দেশের মানুষদের মাঝে চলে এসেছি। চারদিকে বাংলা ভাষার কোলাহল। কেউ চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলছে, কেউ সিলেটি, কেউ বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায়। অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিক। দেশের জন্য যারা রক্তঘাম ঝরিয়ে রেমিট্যান্স পাঠান। বিমানটি ছিল বিশাল। প্রতিটি সারিতে দশজন যাত্রী। একটি সিটও খালি ছিল না।অবশেষে আমরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ ২০ মে'২০২৬ রাত আড়াইটায় পৌঁছালাম।

ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজ বেল্টে এলাম। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও লাগেজ আসছিল না। মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠছিল। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগলেন। আমি মোবাইলে কিছু ভিডিও করছিলাম। তখন বিমানবন্দরের এক কর্মচারী এসে বললেন, 'এগুলো ডিলিট করে দেন।' কথাটা শুনে আমারও মেজাজ গরম হয়ে গেল। বললাম, 'ডিলিট করব না। আপনাদের অব্যবস্থাপনা থাকলে মানুষ দেখবেও।'

পরে তার ঊর্ধ্বতন একজন এলেন। তিনি উল্টো ওই কর্মচারীকেই ধমক দিলেন। বললেন, 'রেকর্ড করলে সমস্যা কি? ভালো করলে ভালো লিখবেন, খারাপ করলে খারাপ লিখবেন।' ভদ্রলোকের ব্যবহার ভালো লাগল। এদিকে আমাদের চারটি লাগেজ এসে গেছে। কিন্তু একটি লাগেজ নেই। পরে জানানো হলো, দোহা থেকে সেটি ওঠেনি। তিন দিনের মধ্যে কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হলাম। বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বেয়াই এস কে হুদা কচি। তাঁর বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর হয়ে গেল।

দেশে ফেরার পরও ছেলে আর বউমা বারবার ফোন করছিল। ছেলে আফসোস করে বলছিল, 'সামান্য কিছু ডলার বাঁচাতে গিয়ে তোমাদের এত কষ্ট হলো আব্বা।' আমি তাকে বললাম, 'তুই স্কলারশিপ নিয়ে পড়ছিস। তোদেরওতো কষ্ট আছে। বাবা-মা কি কখনো চায় সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ পড়ুক? আসলে কষ্টের চেয়ে বড় ছিল টেনশন। বিশেষ করে ব্যাগ হারানোর মুহূর্তটা। ওই ব্যাগ না পেলে আমরা সত্যিই বড় বিপদে পড়তাম। সবশেষে মনে হয়েছে, মানুষ যত পরিকল্পনাই করুক, শেষ ভরসা আল্লাহই। তাঁর রহমত না থাকলে হয়তো সেই ব্যাগ আর ফিরে পেতাম না।

বিমান পথ পাড়ি দেওয়ার পুরোটা সময় আমার কেবল মনে পড়েছে, নিউইয়র্কের সেই পাতাল স্টেশনে দৌড়ে গিয়ে যখন বউমা ব্যাগটি তুলে নিল, তখন মনে হয়েছিল, দুনিয়ার সব স্বস্তি যেন এক মুহূর্তে বুকের ভেতর নেমে এসেছে।আলহামদুলিল্লাহ, শেষ পর্যন্ত আমরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পেরেছি। ছেলে-বউমাও ভালো আছে। আর এই পুরো যাত্রা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, বিদেশের মাটিতে সন্তানের ভালোবাসা, পরিবারের টান আর বিপদের সময় ধৈর্য, এসবই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।