ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » খেলা » বিস্তারিত

নিপীড়িতের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর গার্দিওলা

২০২৬ মে ২৩ ১৩:১৪:৫৬
নিপীড়িতের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর গার্দিওলা

স্পোর্টস ডেস্ক : লিভারপুলের কিংবদন্তি ম্যানেজার বিল শ্যাঙ্কলি বিশ্বাস করতেন, ফুটবল কেবল জীবন-মরণের খেলা নয়; তার চেয়েও ‘অনেক, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ তবে ম্যানচেস্টার সিটির বিদায়ী মাস্টারমাইন্ড পেপ গার্দিওলার কাছে এই ‘সুন্দর খেলাটির’ বাইরেও এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা ফুটবলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যানচেস্টার সিটির ডাগআউটে ১০ বছরের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ে ২০টি ট্রফি জিতে আগামী রবিবার বিদায় নিচ্ছেন ৫৫ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ কোচ। কিন্তু গার্দিওলার রেখে যাওয়া ‘লিগ্যাসি’ কেবল এই সোনালি ট্রফিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি একজন ফুটবল ম্যানেজারের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের হাই-প্রোফাইল পরিচিতি ও কণ্ঠস্বরকে সবসময় ব্যবহার করেছেন মানবতা এবং অবহেলিত মানুষের অধিকার রক্ষার এক শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে।

গাজার ফিলিস্তিনি শিশুদের দুর্দশা থেকে শুরু করে নিজ জন্মভূমি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা যুক্তরাজ্যের গৃহহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো; গত এক দশকে গার্দিওলা বারবার ফুটবলের সীমানা পেরিয়ে সমাজের নানা স্তরের জন্য লড়েছেন।
একটি উন্নত ও মানবিক সমাজ গঠনে নিজের অবস্থান থেকে কথা বলতে তিনি কখনোই দ্বিধাবোধ করেননি।

সাম্প্রতিক সময়ে গার্দিওলা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন ইসরায়েলের সঙ্গে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে গাজার ফিলিস্তিনি শিশুদের চরম মানবিক বিপর্যয় ও তাদের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় কষ্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই ভয়াবহ যুদ্ধে গাজায় অন্তত ৭২ হাজার ৫৬৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই অবুঝ শিশু ও কিশোর। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও লাখ লাখবাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গাজার এই নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ গার্দিওলাকে এতটা নাড়া দিয়েছিল যে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ‘অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্টাইন’ নামক একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ম্যানচেস্টার সিটির একটি প্রি-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত মিস করেছিলেন।

সেদিন গলায় ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী কেফিয়াহ জড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে গার্দিওলা বলেছিলেন, “গত দুই বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা টেলিভিশনে যখন কোনো শিশুকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নিজেকে রেকর্ড করে ‘আমার মা কোথায়?’ বলে আকুতি জানাতে দেখি, তখন আমরা কী ভাবি? আমি সবসময় ভাবি ওই নিষ্পাপ শিশুগুলো আমাদের সম্পর্কে কী ভাবছে? আমার মনে হয়, আমরা ওদের একদম একা ফেলে এসেছি, পরিত্যাগ করেছি।”

মানবিক কারণে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, গার্দিওলার এই রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের ইহুদি সম্প্রদায় তার এই ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করেছে। গত বছর তার করা কিছু মন্তব্যের পর ‘জুইশ রিপ্রেনার্জেন্টিটিভ কাউন্সিল অফ গ্রেটার ম্যানচেস্টার অ্যান্ড রিজিয়ন’ ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারকের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে তারা দাবি করে, গার্দিওলার এমন মন্তব্য ম্যানচেস্টারে বসবাসরত ইহুদিদের জীবনকে ‘ঝুঁকির মুখে’ ফেলছে।

তবে কোনো চাপ বা সমালোচনাই গার্দিওলাকে দমাতে পারেনি। ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন নিজের মাতৃভূমি কাতালোনিয়ার কারাবন্দি রাজবন্দিদের সমর্থনে পোশাকে ‘হলুদ রিবন’ পরার অপরাধে ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল। গার্দিওলা তখনো নিজের আদর্শে অবিচল ছিলেন, এখনো আছেন।

কেবল ফিলিস্তিন নয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও ইউক্রেন ও সুদানের সহিংসতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘আইস’ (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এজেন্টদের হাতে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘যখন আপনার কোনো আদর্শ থাকে এবং সেটি রক্ষার নামে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে হয়; আই অ্যাম সরি, আমি এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবো। সবসময় আমি মানবতার পক্ষে থাকবো, সবসময়।’

অবশ্য এই অবস্থানের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। ম্যানচেস্টারের ইহুদি কাউন্সিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, বিশ্বজুড়ে চলা সহিংসতা নিয়ে গার্দিওলা সরব হলেও, ইতিহাদ স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে একটি সিনাগগে (ইহুদি উপাসনালয়) সন্ত্রাসী হামলায় দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি কোনো সমবেদনা জানাননি বা ইহুদি সম্প্রদায়ের পাশে এসে দাঁড়াননি।

সুদূর ফিলিস্তিন বা ইউক্রেনই নয়, নিজের ঘরের কাছের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতিও সমান সহানুভূতিশীল গার্দিওলা। বেশ কয়েক বছর ধরে তার ব্যক্তিগত দাতব্য সংস্থা ‘গার্দিওলা সালা ফাউন্ডেশন’ যুক্তরাজ্যের গৃহহীন মানুষদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে ‘স্যালভেশন আর্মি পার্টনারশিপ ট্রফি’ নামক একটি ‘ফাইভ-এ-সাইড’ ফুটবল টুর্নামেন্টে নিয়মিত সমর্থন দিয়ে আসছেন তিনি, যা গৃহহীনদের পুনর্বাসন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

ফুটবলের এই মানবিক শক্তি নিয়ে গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘ফুটবল কীভাবে মানুষকে একত্রিত করতে পারে এবং জীবনের কঠিনতম ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, তা নিজের চোখে দেখা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’

পেপ গার্দিওলা হয়তো ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু মাঠের ফুটবলে একের পর এক ট্রফি জয়ের কীর্তির পাশাপাশি ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব মানবতার জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করার যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

(ওএস/এএস/মে ২৩, ২০২৬)