প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার » বিস্তারিত
জীবন তো বহমান স্রোত
২০২৬ মে ৩০ ২২:৫৩:০৭
সুপ্রিয় অভিনেতা তারিক আনাম খান। বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার মনজিৎপুর মহল্লায় শৈশব-কৈশর কেটেছে এই জেলাতেই। তাঁর বাবা ভাল ইংরেজি জানতেন। পাশপাশি নাটকে অভিনয় করতেন। তাকে ইন্দ্রজিৎ নাটকেও অভিনয় করতে দেখেছি। আমাদের পরিবারে সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। সেই সুবাধে আমিও নাটকে যোগ দেই। বাবাকে পরে দেখিছি থিয়েটারে প্রোম্পিটিং করতে। তিনি একজন ভাল প্রোম্পিটিং মাস্টার ছিলেন। আমার বাবা টিপু সুলতান নাটকে অভিনয় করেছিলেন। বাবার এই অভিনয় ক্ষমতা দেখে দেখে বড় হওয়া। বাবা বলতেন সিম্পল লিভিং এ্যান্ড হাই থিংকিং। তাকে নিয়ে লিখেছেন পীযূষ সিকদার:-
আপনি ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার না, কেন থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করলেন?
তারিক আনাম খান: তিনি হেসে বললেন, বলতে পার পীযূষ এটা আমার ভবিতব্য। যদিও ভবিতব্য নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। আমি কাজ পছন্দ করতাম তাই করি। মা রান্না করতেন, আমি খড়ি ফেড়ে দিতাম। কাজের প্রতি আমার কখনই আমার অনীহা ছিলনা-কোন্টা ছোট আর কোন্টা বড় কাজ।
অভিনেতা হিসেবে নিজেকে কিভাবে তৈরি করলেন?
তারিক আনাম খান: আমার বাড়িতে সবসময় সাংস্কৃতিক একটা আবহ ছিল। আমার কাকা ও কাকাতো ভাইয়েরা নাটক ও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। সেই থেকে অভিনয়ের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। তখনও ভাবিনি, যে আমি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি ) নিয়ে পড়াশোনার জন্য দিল্লিতে যাব। ডাক্তারি পড়বো, এতো এতো বই পড়তে হবে, সে কারণে ডাক্তারের দিকে মন যায় নি। আমার মন গিয়েছিলে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে, সেখানে পড়াশোনাটা একটু কম। আমাকে অভিনেতা তৈরিতে যারা ভূমিকা রেখেছে, তাদের অভিনয় দেখে ও শুনে শুনে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। শাঁওলী মিত্র, কেয়া চৌধুরী, মাধুরী মুখোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, এঁদের অভিনয় শুনে শুনে কান তৈরি হয়েছে।
আপনার পরিবার নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
তারিক আনাম খান: আমার বাবা থিয়েটার-পাগল মানুষ ছিলেন। আমার মা এ নিয়ে বাবাকে কিছু বলেননি কখনই। আগেই বলেছি, বাবার ইংরেজিতে দক্ষতা ছিল বেশ। সেই গুণটা পিতৃসূত্রে পেয়েছি অভিনয়ের কারণে। আমাদের পরিবার ছিল প্রগতিশীল পরিবার। আমার চাচা ঊনসত্তর সালে আয়ুব খানের বিরুদ্ধে নাটক করেছেন। বলতে গেলে, আমাদের পুরো পরিবারটিই সাংস্কৃতিক পরিম-লের ভিতরেই ছিল।
আমি জানি আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা?
তারিক আনাম খান: হ্যাঁ, আমি মহান ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে উৎসাহ দিয়েছি।
সেটা কিভাবে?
তারিক আনাম খান: নাটক দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি ৯নং সেক্টরে যোগ দেই।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, যুদ্ধের পরেও যুদ্ধ থেকে যায়?
তারিক আনাম খান: হ্যাঁ, সে যুদ্ধ এখনও করছি। তবে রাজনীতি আমার কাজ না। রাজনৈতিক সচেতনতা দরকার থিয়েটার করতে গেলে। যুদ্ধের পরে আমি গ্রুপ থিয়েটারের সাথে যুক্ত হই। ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো, চিন্তাও করতাম না। আমি জানতাম আমার বাবা টাকা দিবে কোথা থেকে। তাই আমি ঢাকায় বোরহান উদ্দিন কলেজে নাইট শিপটে ভর্তি হলাম। গ্রুপ থিয়েটারে শুরু থেকেই ছিলাম। সংগীত-নৃত্য-নাট্যাভিনয় এর প্রতি আগ্রহ আমার বরাবর ছিল। ১৯৭৩ সালের দিকে থিয়েটার নাট্যদলে যোগ দেই। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। টিকিট কেটে নাটক দেখার পয়সা নাই। তবুও পয়সা যোগাড় থিয়েটার দেখতাম। ‘বাকি ইতিহাস নাটকই আমার দুচোখ খুলে দিয়েছে’। একুশ ফেব্রুয়ারিতে নাটক হতো। নাটক দেখতাম।
আমরা জানি, আপনি এনএসডি থেকে থিয়েটারের ওপর ডিগ্রি নিয়েছেন?
তারিক আনাম খান: হ্যাঁ। হাসান ইমাম যখন বললেন, তারিক, তুমি নাটকের ওপর পড়াশোনা করে আস। তখন আমার ভিতরে ক্রিয়া-বিক্রিয়া হলো। আমি এবং বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর ছেলে ইন্টারভিউতে পাস করলাম। ভিতরে আনন্দ। যদিও আমার চাচাতো ভাই পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে গেলেন। আমার তখন মনে হলো, ফিল্ম এর এ্যাক্টিংটা জানা দরকার। আমার টানটা ছিল ফিল্মের প্রতি। সৈয়দ হাসান ইমাম সাহেব আমাকে বললেন, তুমি ফিল্ম না পড়ে ন্যাশনাল স্কুল এ্যান্ড ড্রামাতে পড়ো। আমার ভিতরে একটি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করল। আমার ভাল প্যান্ট নেই, ভাল জুতা নেই, ভাল সার্ট নেই। বন্ধুদের কাছ থেকে এগুলো সংগ্রহ করলাম। এবং ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ভর্তি হলাম। আমার ভিতরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও আমি সিদ্ধান্তটা সঠিক নিয়েছিলাম। আমার মনে হলো, পৃথিবীটা আমার সামনে হাজির হলো। যেখানেই অন্ধকার, সেখানেই আলো ফেলতে হবে। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব পরিশ্রমই। থালাবাসন মাজতাম, কাঠ কাটতাম। আমাকে কেউ বলেনি, তবুও আমি এই কাজগুলো করেছি নিজের ইচ্ছায়। মাকে সাহায্য করতাম। কোন্ কাজটা ছোট, কোন্ কাজটা বড় এটা কখনও ভাবিনি। যুদ্ধের সময় না খেয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। এনএসডিতে আমার তিন বছর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে গেছে। এনএসডিতে তিন বছর এমন ভাবে কাটিয়েছি যে, পড়াশোনার বাইরে অন্য কিছু করার ইচ্ছাটাই ছিল না। এনএসডি’র শিক্ষগণ খুব ভাল ছিলেন। ইংরেজি শিক্ষাটা ছয় মাসে প্রস্তুত করলাম। ঐ বছরই অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে বিটিভি’র তালিকাভুক্ত শিল্পী হলাম। তুমি চা খাবে, না স্যার। কথা বলি। এনএসডি থেকে এসে মনে হলো, প্রোফেশনাল থিয়েটার করা দরকার।
প্রোফেশনাল থিয়েটার করতে পেরেছেন কী?
তারিক আনাম খান: চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হয়নি। এনএসডি থেকে এসে টেলিভিশন, মঞ্চ, ও অন্যান্য মাধ্যমে অভিনয় শুরু করলাম। তখন এক থেকে দেড়শো টাকা আয় হতো। ও দিয়ে দিন চলতো না। নাটক করতে যেতাম কখনও হেঁটে, কখনও বাসে করে। টিভিতে তখন লাল-সবুজের পালাটা ধারাবাহিকভাবে চলতো। সুবর্ণা ছিলেন, রাইসুল ইসলাম আসাদ ছিলেন। এ কাজটি করতে গিয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পরি। আমার টিবি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে সুস্থ হলাম।
আব্দুল্লাহ আল-মামুন যেভাবে আমাকে মূল্য দিতেন, কথা বলতেনÑতাতে আমি মুগ্ধ ছিলাম। তিনি বললেন, আমার সাথে কাজ করো। তোমরা তো নাটক শিখে আসছো। নাগরিক আমার মনের মতো গ্রুপ। আমি আলী যাকেরের সাথে দেখা করে ছিলাম। বাচ্চু ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিলাম। তখন উনি বিটিবি’র প্রোডিউসার। টেলিভিশনে কাজ করার চেষ্টা করছি। এই রকম অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে টেলিভিশনে যাই। কাজ করি। শেষমেষ আব্দুল্লাহ আল মামুন সাহেব বললেন, তুমি ‘ওথেলো করো। কবির চৌধুরীর অনুবাদ। এই হচ্ছে ঘটনা। কমেই আমি আনন্দ খুঁজে পাই। ওইটেি আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি কোনো এক্সপেক্টটেশন ছাড়া। আমি থিয়েটারে জয়েন করেছি। চিন্তা ভাবনার পার্থক্য থাকার পরও আমি থিয়েটারে জয়েন করেছি। সিরিজ নাটক। বাচ্চু বাচ্চু ভাই চেখভের একটি নাটকের রূপান্তর সেলিম ভাইয়ের একটি নাটক ‘প্রজাপতি-তে কাজ করি। আতিকুল হক সেই সময়ের নাম করা ডিরেক্টর। উনার নাটক এলেই ডাক পেতাম। যেহেতু ভালো নাটক করবো। মলিয়েরের কমেডি বিচ্ছু এই লক্ষ্য নিয়ে করা। কঞ্জুস-৮৯। করেছি। নতুন দল করেছি। নাট্যকেন্দ্র। মলিয়েরের কমেডি ‘বিচ্ছু’ চুপচুপ করে লিখে ফেললাম। বিচ্ছু সাড়াজাগানো নাটক হলো। ইংরেজিতে পিএইচডি থেকেই পারদর্শী হয়ে উঠেছি। পরবর্তীতে আমরা থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে আমি তৌকির, ঝুনা, মেঘনা।
সৈয়দ সামসুল হক’র অনুবাদ ‘জুলিয়াস সিজার’, মলিয়ের ‘বিচ্ছু’। আমাদের মধ্যে চ্যালেঞ্জ নেয়ার একটা বিষয় ছিলো। এই যে ‘বিচ্ছু’ করছি। সুপার হিট। .....আর কমেডির দিকে না যেয়ে ‘তুঘলক’ নিয়ে কাজ করলাম। দুটি বিপরীতধর্মী রচনা।
যখন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এলাম। থিয়েটারের দুই গ্রুপ। আমরা সেদিকে না যেয়ে দলের নাম রাকলাম ‘নাট্যকেন্দ্র’। যদিও অনেক রকমের নাম নিয়ে আমরা গবেষণা করেছি। ভেবে চিন্তে ‘থিয়েটার ইউনিট’ অন্য দলের কাছাকাছি নামও আমার মনে ধরেনি। পরে সবাই বসে ‘নাট্যকেন্দ্র’ নামটি সিলেক্ট করলাম। নতুন কিছু করবো এমন ধারণা প্রথম থেকেই ছিলো। ‘বিচ্ছু শো করার পর বিরাট প্রশংসা করেছে। আবার চারদিকে বদনামও ছড়ালো। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। পরতে পরতে রিউমার। ব্রেস্ট থেকে মলিয়ের থেকে নিয়েছিলাম। ভাবলাম, এখন একটু বিপরীতে হাঁটবো। বেছে নিলাম গিরিশ কার্নাডের ‘তুঘলক’। আমি কাজের মধ্যে থাকতে পছন্দ করি। রিহার্সেল রুম্ ামার তৈরি হওয়া বা তৈরি করার জায়গা। আমি সবার সাথে ডিসকাস করে সিদ্ধান্ত নেই।
আপনি দেখতে দারুন। সুন্দর বাচনভঙ্গি। জীবনকে ব্যখ্যা করতে পারেন। কখনও শিক্ষক হতে ইচ্ছে করেনি?
তারিক আনাম খান: না। বোধ হয়। ইচ্ছে হয়নি। ওই যে ভবিতব্য বলে কিছু থাকে। বাকি কারণ নিশ্চয়ই কিছু থাকে। আমি ভাগ্যকে নিয়ে থাকি না। নিজেকে বদলে দেবার একটা গভীর চিন্তা থাকে। কার্যকরণ ছাড়া কিছু হয় না। আমি কাজকে অবহেলা করি না। রেডিওতে একটা সিরিজ নাটক হচ্ছে করি। বিদেশ থেকে সিনেমা বানানোর জন্য এসেছে তাদের সাথে কাজ করি। বলেছি নাÑছোটবেলা থেকেই কাজকে পছন্দ করি।
আমার চারপাশ সমাজ, মানুষ আমার কাছে চমৎকার লাগে। একটা সময় সীমার মধ্যে কোনো চাকরি-বাকরি তো করলাম না। কিছু একটা তো করতে হবে। নইলে সংসার চলবে কেমনে! তখন আমি একটা বিজ্ঞাপনি সংস্থা খুললাম। সবাই যখন পারে আমি পারব না কেন? খুব কষ্ট হচ্ছে। এইভাবে বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় না। কষ্ট হয়। জানি না একটা বিজ্ঞাপন কিভাবে বানাতে হয়। তবে বিজ্ঞাপন তো দেখেছি। কিন্তু বিজ্ঞাপন তো পাইনা। একটা সময় মনে হয় লোকজন এগিয়ে আসে। আমার বেলায়ও তাই হয়েছে। সেলিম ভাই নাটকের উপর ডিপার্টমেন্ট খুললেন। প্রথম দিকে আমি ক্লাস নিয়েছি। কিভাবে একটি ডিপার্টমেন্ট হয় তাতো নিজের চোখেই দেখেছি। প্রতিদিন জাহাঙ্গীরনগর যেতাম। ওসমানী উদ্যান থেকে জবির বাসে উঠতাম আবার বাসে করেই আসতাম। অন্যদিকে সৈয়দ জামিল আহমেদ মাস্টার্স করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার ডিপার্টমেন্ট খুললেন। এদিকে আমার বিজ্ঞাপনি সংস্থায় অনেক কাজ। এই কাজ না থাকলে বাইরে থেকে এমএ করে এসে জা.বি. অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্কিষক হিসেবে ঢুকতাম। আগেই বলেছি, ভাগ্যেও আমার বিশ্বাস নেই। আমি যা পেয়েছি কাজ করেই অর্জন করেছি। পিএইচডি করলাম। আমার মাস্টারই করতে হবে এমন কোনো ই্েচছ আমার ছিলো না। তবে অনেক প্রশিক্ষণ দিয়েছি। শান্তা, শিরীন বকুল, মেঘনা এরা আমার দলেই এলো। আমি বিভিন্ন দলের ওয়ার্কসপ করিয়েছি। এই কাজটাকে আমি ভীষণ এনজয় করতাম। এমনটি ভাবিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেবো।
আপনার ভাবনার মধ্যেই আসেনি।
তারিক আনাম খান: ঠিক।
আপনারা তো ছেলেমেয়েদের তৈরি করছেন। এই হিসেবে আপনি শিক্ষকতাই করেছেন।
তারিক আনাম খান: তা ঠিক।
স্যার, আপনি অনেক ভালো ভালো নাটক উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন আপনার ছেলেমেয়েরা অভিনয় করছে। এক কথায় বলা যায় তারা শেষ পর্যন্ত আপনাকেই অনুকরণ করছে।
তারিক আনাম খান: কই, না তো।
এটা একান্ত আমার অভিপ্রায় আপনি যেভাবে হাঁটেন, আপনার হাত যেভাবে নড়ে, আপনি যেভাবে কথা বলেন। ওরা সে ভাবেই কথা বলছে। আমার কথা হচ্ছে অভিনয় তো সৃষ্টিশীল পেশা। এতে কী সৃষ্টিশীলথার ব্যঘাত ঘটছে না! আমি আপনাদের প্রায় সব নাটকই দেখেছি। তাতে মনে হয় আপনার সকল অভিনেতা/অভিনেত্রী অবিকল আপনাকে কপি করছে! আবারও বলছি অভিনয় তো সৃষ্টিমীল পেশা। তার চলনে-বলনে সৃজনের আনন্দ উল্লাস থাকবে। সেটি মনে হয়নি। আপনি কী আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন। স্যার!
তারিক আনাম খান: তোমার কাছে প্রথম শুনলাম। এর আগে কেউ আমাকে এভাবে বলেনি। তুমি কী শুধু নাট্যকেন্দ্রের নাটকের কথা বলছো। তার চরিত্রদের কথা?
হ্যাঁ।
তারিক আনাম খান: আমি তো কখনো এভাবে দেখিনি। অভিনেতাদের তিনটি জিনিস দরকার। ১. তার কণ্ঠস্বর, ২. তার শারীরিক গড়ন, ৩. অবজারভেশন। এই যে ধরো মশাররফ করিম। মশাররফ করিম আমার সাথে ১২ বছর কাজ করেছে। আমার মনে হয় না মশাররফ করিম আমাকে কপি করছে। ‘বিচ্ছু’ নাটকে অঙ্গভঙ্গি অনেক বেশি। কিন্তু ‘তুঘলক’ একটি সিরিয়াস নাটক। আমাকে তুমিই বললে প্রথম যে আমাকে ওরা কপি করছে।
‘তুঘলক’ সময়ের চেয়ে এগিয়ে একটি ঘটনাবহুল নাটক। ‘তুঘলক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাটক। তুমি বলছো যে, ওরা আমাকে কপি করছে।
আপনি থিয়েটার থেকে বের হয়ে এলেন কেন?
তারিক আনাম খান: থিয়েটার যে ঘরানায় নাটক করে। আমি, ঝুনা চৌধুরী, তৌকির আহমেদ ও মেঘনা সেই ঘরানাকে পছন্দ করতাম না। তাই থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসলাম। আমার দল ‘নাট্যকেন্দ্র’র সাথে ‘থিয়েটার’ দলের পার্থক্য ওরা দর্শকের সাথে বেশি বেশি কমিউনিকেট করতে চায়Ñযেটা আমরা পছন্দ করতাম না। কিন্তু আমাদের নাটক দর্শকের দিকে না তাকিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে। আলো, ফোকাস এর মাধ্যমে আমি আমার অভিনেতাদের বুঝিয়ে দেই। সে আমারটাই প্লে করে। আর তুমি বলছো, আমাকেই অনুকরণ করে। আমি চরিত্রটাকে বুঝিয়ে দেই, কেনো তুমি এখানে? পারপাসটা কী? সে যদি অন্য ইন্টারপ্রেটেশনে যেতে চায়, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
এখানে আমার দেখার ভুল হতে পারে। সৃষ্টি তো আপনার। আপনার মতোই হবে এটাই স্বাভাবিক। অভিনয় তো সৃজন আনন্দে মাতে। তাই অভিনয় সৃজনে সৃজনে সৃষ্টিশীল হয়। একজন অভিনেতার অভিনেতা হতে গেলে কী প্রয়োজন হয়?
তারিক আনাম খান: একজন অভিনেতাকে, অভিনেতা হতে গেলে, ওভারঅল তিনটি জিনিস দরকার। ১. কণ্ঠস্বর, ২. চোখ, ৩. দেহ-ভঙ্গি। তুমি কতটুকু দেখেছো। ‘বিচ্ছু’-তে আমি একধরনের জেসচার ব্যবহার করেছি। ইচ্ছে করেই। ‘তুঘলক’-এ আরেক রকমের। তুমি বলছো এরা আমাকে কপি করছে। হয় তো ঠিক, হয় তো ঠিখ না। প্রত্যেকটা চরিত্রকে আমি রূপ দেবার চেষ্টা করেছি। এটা কপি না। নিজস্ব রূপদান।
‘সীমাবদ্ধতা আশীর্বাদ হয়’ আপনার এই তিনটি শব্দ আমাকে আমুল পাল্টে দিয়েছে। হতে চেয়েছিলাম অভিনেতা, হতে পারিনি। হতে চেয়েছিলাম লেখক। হতে পারিনি। হতে চেয়েছিলাম ডিরেক্টর, হতে পারিনি। কিন্তু আপনার এই তিনটি শব্দ আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আমার প্রচুর সীমাবদ্ধতা। দেখি পরবর্তীতে আমার এই সীমাবদ্ধতা। আমার কাছে ধরা দিয়েছে নতুন রূপে। আপনি লেখেন সুন্দর। আপনার অভিনয় সুন্দর। আপনি দাঁড়ালেই অভিনেতা হয়ে যান?
তারিক আনাম খান: তুমি যেমনটি বলছো ওমনটি নয়।
না না বলতে চাচ্ছি, আপনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই অভিনেতা হয়ে যান।
তারিক আনাম খান: এটা গড গিফটেড। আমার যে হাইট এটা কাজ করতে গেলে টের পাই। আমার এই হাইট কাজে লেগেছে অভিনয়ে। আমার দ্বারা যে চরিত্র করা সম্ভব কিন্তু ফজলুর রহমান বাবু’র দ্বারা সে চরিত্র করা সম্ভব নয়। আমার যে হাইট, আমার যে বাচনভঙ্গি, আমার যে কথা বলা। অভিনেতা অভিনেতায় পার্থক্য আছে। প্রতম যখন ইন্ডাষ্ট্রিজ-এ আসে তখন তার হাইটটাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তোমার যে চেহারা সেটা তুমি জন্মগত ভাবে পেয়েছো। প্রথমদিকে তোমাকে অনেক ফাইট করে ইন্ডাষ্ট্রিতে ঢুকতে হবে। আমার বেলায় হয়েছে। আমি তাও তো রীতিমত হাস্যকর হাইট। কিন্তু সেটা সে কাজে লাগিয়েছে। তুমি যে বললে, সীমাবদ্ধতা আশীর্বাদ হয়। আমরা বহু রকম সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করি। একই সময় নেগেটিভ যে জিনিসটা সেটাই দর্শকের ভালো লেগে যায়। চার্লি চ্যাপলিন একটা বেকাতেড়া মানুষ। সে এখনো পৃথিবীর মানুষকে ভাবায়। চা খাবে।
আপনার কথাই ভাল লাগছে।
তারিক আনাম খান: পীযূষ তুমি যদি হতে চাও। তোমাকেও যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধকে ভয় পেলে চলবে না। হেরে তুমি যেতেই পারো। একটু পরে তুমিই জিতবে। অমিতাভ বচ্চন পুলিশের রোল করতে গেছে। সার্ট ঢোলা। দেখতে বেমানান লাগছে। অমিতাভ বচ্চন হুট করে সার্ট গিট্টু মেরে দিলেন। বক্স অফিস হিট। অভিনেতাদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধি থাকতে হয়।
আমরা স্যার শেষের দিকে চলে এসেছি। যদি আপনার জন্মের তারিখটা বলতেন?
তারিক আনাম খান: ১০ মে ১৯৫৩। পীযূষ অভিনেতাদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই।
সেলিম আল দীন আমার শিক্ষক। তাঁর অনেক কিছুই আমার ভালো লাগতো। ডিপার্টমেন্টে যাঁকে যাঁকে প্রয়োজন, তাঁকে তাঁকে দিয়ে ক্লাস নিয়েছেন। এইটা আমার কাছে আশ্চর্য লাগে!
তারিক আনাম খান: সেলিম ভাই আমাকে খুব পছন্দ করতো। আমি যেতাম তোমাদের জাহাঙ্গীরনগরে। একদিন জাহাঙ্গীরনগরে ‘বিচ্ছু’ নিয়ে গেছি। সে সিঁড়িতে না বসে, একটি চেয়ার নিয়ে চুপিসারে নাটক দেখছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুক্তমঞ্চে’ আমরা যখন নাটক করতে যাই, তখন সেলিম ভাইয়ের সাথে দেখা করেছি। ‘বিচ্ছু’ নাটক দেখে সেলিম ভাই সবচেয়ে হাইয়েস্ট কমেন্ট করেছেন। ওই তারিক, এটাকে নিছক হাসির নাটক কে বলেছে? না। এই নাটকে ক্ষয়িষ্ণু বুর্জোয়াদের প্রতি প্রচ- বিদ্রুপ। চাকর মানে সর্ব নীচ একটি মানুষ। কিন্তু এই নাটক চাকরই মূল ঘটনাটা ঘটায়। কে বলেছে এটি নিছক হাসির নাটক। সেলিম ভাই আমাকে প্রচ- ¯েœহ করতেন। সেলিম ভাইকে বললাম, আপনার একটা নাটক দেন। সেলিম ভাই বললেন, আমার নাটক তুই পারবি না। সেলিম ভাইয়ের এই কথাগুলো খুব মজা পেয়েছি। মাসুম রেজা একটি নাটক লিখেছে, ওই নাটকটা কর। জার্মানির একজন বিখ্যাত ডিরেক্টর ফ্রিৎস বেনেবিথ। বাংলাদেশে এসেছিলো। ম্যান ইকুয়ালস ম্যান। লোক সমান লোক। মহিলা সমিতিতে শো হলো। ফ্রিৎস বেনিবিথ চলে গেছে। সেলিম আল দীন। ঢুকলেন। আমরা সব সময়ই ভিআইপিদের আলাদা নজর দিই। লোক সমান লোক নাটকটি শেষ। ভালেই হলো। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস্ তাঁর যাত্রা পরিবর্তন করেছে। তখন ফ্রিৎস বেনিবিথ ‘বিচ্ছু’ দেখলেন। বললেন আমি খুব ধন্যবাদ জানাই ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস্-কে, যে তারা আমার যাত্রা বাতিল করেছে। এতে করেই আমার সুন্দর একটা নাটক দেখা হলো। সেলিম ভাই ও ফ্রিৎস বেনিবিথ আমাদের নাটক ‘বিচ্ছু’র ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জীবন যদি বহমান স্রোত হয়। এই বহমানতা খুব দরকার। ভেঙ্গে-চুড়ে এগিয়ে যাবে। দুধ চা, না রং চা। রং চা।
ভারতে ফিল্মটা এগিয়েছে।
তাও ভালো। আমাদের মঞ্চ নাটক তো এগিয়েছে।
তারিক আনাম খান: হ্যাঁ। জীবন যদি বহমান নদী হয় তা সে নিজের মতো করে একটা গতিপথ নির্ধারণ করে নেয়। ১৯৭৩ সালে যে গ্রুপ থিয়েটার কনসেপ্ট শুরু হয়েছে। এখন সেমি গবেষণার সময় এসেছে। আমরা সবাই ভালো আর তোমরা সবাই খারাপ। আসল কথা হলো থিয়েটারের মধ্যে রাজনীতি ঢুকে গেছে। আমি তো রাজনীতি করতে আসি নাই। আমি যে কাজটি করি সেটি রাজনীতি সম্পৃক্ত।
যাই হোক। আমার একটি জিনিস ভালো লাগছে। আপনারা এখনো থিয়েটার করছেন, ভাবছেন।
তারিক আনাম খান: নতুন নাটক আনছি। ইতালিয়ান নাট্যকার, নোবেল জয়ী ডারিওফো-র একটি নাটক মঞ্চে আনছি।
নাটকের নামটি জানতে পারি?
তারিক আনাম খান: না। সময়ে সব জানা যাবে। আমরা আগস্ট/সেপ্টেম্বর নাগাদ নাটকটি মঞ্চে আনবো।
আপনাকে ধন্যবাদ, এতটা সময় দেয়ার জন্য।
তারিক আনাম খান: তোমাকেও ধন্যবাদ। এগিয়ে যাও।
ইতি-
পীযূস সিকদার
পৃথ্বিরাজ ভিলা
সিকদার বাড়ি, কানাইপুর, ফরিদপুর।
