ঢাকা, সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্প: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

২০২৬ জুন ০১ ১৮:১৫:০৬
বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্প: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

ওয়াজেদুর রহমান কনক


বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পায়নের পথে পা বাড়ালেও এই খাতটি এখনো নানাবিধ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দুগ্ধশিল্প গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবাদি পশুর খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা এবং টেকসই কোল্ড চেইন বা হিমায়িত সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা খামারিদের নিরুৎসাহিত করছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা যখন তাদের উৎপাদিত দুধের সঠিক বাজারজাতকরণে ব্যর্থ হন, তখন পুরো দুগ্ধ ইকোসিস্টেমের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের এই প্রতিকূলতার মাঝেও অপার সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির হাত ধরে। বর্তমানে গবাদি পশুর উন্নত জাত উন্নয়ন এবং খামারিদের মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ব্যবহারের হার বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার নতুন ধারা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কাটিয়ে ওঠার একটি কার্যকর উপায় তৈরি করেছে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা এবং ঘাস চাষের আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার সুযোগ এখন অনেক বেশি।

জাতীয় পর্যায়ে এই শিল্পের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ এবং খামারিদের জন্য সুলভ মূল্যে উন্নত জাতের গবাদি পশু ও সুষম গো-খাদ্য সরবরাহে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জরুরি। একইসাথে, তরুণ উদ্যোক্তাদের দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে গবাদি পশুকে রক্ষা করতে অভিযোজনমুখী খামার ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগকালীন সময়ে পশু খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সর্বোপরি, দুগ্ধশিল্পকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এই খাতকে জাতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে সুসংহত করতে সক্ষম হব।

বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পায়নের পথে পা বাড়ালেও এই খাতটি এখনো নানাবিধ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দুগ্ধশিল্প গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দুধের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ১৪.০৬ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে, যা গত দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবে মাথাপিছু দৈনিক দুধের চাহিদাকে বিবেচনায় নিলে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ২৫০ মিলিলিটার, সেখানে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে এখনো চাহিদার প্রায় ৬৭ থেকে ৭০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ঘাটতি মেটাতে আমদানিনির্ভরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবাদি পশুর দানাদার খাদ্য ও খড়সহ অন্যান্য উপকরণের দাম প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ এখন খামারিদের লাভের সীমানাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে, যেখানে উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই চলে যায় শুধুমাত্র গো-খাদ্যের পেছনে।

বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের এই প্রতিকূলতার মাঝেও অপার সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির হাত ধরে। বর্তমানে গবাদি পশুর উন্নত জাত উন্নয়ন এবং কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে দুধের গড় উৎপাদনশীলতা স্থানীয় জাতের গাভীর ক্ষেত্রে দৈনিক ২-৩ লিটার থেকে উন্নত জাতের ক্ষেত্রে ১২-১৫ লিটারে উন্নীত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৮০ শতাংশ দুগ্ধ খামারি এখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়োজিত, যারা দেশের মোট দুধ উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ জোগান দিচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার নতুন ধারা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কাটিয়ে ওঠার একটি কার্যকর উপায় তৈরি করেছে, যা বিপণন খরচ প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত আধুনিক রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা এবং নেপিয়ারসহ উচ্চফলনশীল ঘাস চাষের প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার সুযোগ এখন অনেক বেশি, যেখানে সুষম ঘাস খাওয়ালে দুধের উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

জাতীয় পর্যায়ে এই শিল্পের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ এবং খামারিদের জন্য সুলভ মূল্যে উন্নত জাতের গবাদি পশু ও সুষম গো-খাদ্য সরবরাহে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জরুরি। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত দুধের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ সংগঠিত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের আওতায় আসে, বাকিটা অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিক্রি হয়, যা মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণ উদ্যোক্তাদের দুগ্ধ খামার ব্যবস্থাপনায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যা এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারকে বর্তমানে বিদ্যমান প্রায় ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করতে সহায়তা করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে গবাদি পশুকে রক্ষা করতে অভিযোজনমুখী খামার ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগকালীন সময়ে পশু খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে যেখানে পশুখাদ্য সংকট একটি নিয়মিত সমস্যা। সর্বোপরি, দুগ্ধশিল্পকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এই খাতকে জাতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে সুসংহত করতে সক্ষম হব।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।