প্রচ্ছদ » শিল্প-সাহিত্য » বিস্তারিত
অম্লান ইতিহাস
২০২৬ জুন ০২ ১৯:১৬:২০
মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
ইতিহাস কোনো সরল পথ নয়—
এ এক অগ্নিগর্ভ ভাঙনের বুক চিরে বয়ে চলা অবিরাম প্রবাহ,
যেখানে রক্তের লেখা, অশ্রুর নীরবতা আর উচ্চারণের আগুন
মিলে জন্ম দেয় জাতির অমর ইতিহাসের অক্ষরগাথা।
সেই প্রবাহের গভীর থেকে উঠে আসে এক নাম—
তোফায়েল আহমেদ।
ভোলার ধূলিমাখা মাটির বুক থেকে উঠে আসা এক তরুণ কণ্ঠ—
যে কণ্ঠ ধীরে ধীরে পরিণত হয় ঢাকার রাজপথে বজ্রের গর্জনে।
যে উচ্চারণ একদিন ছিল অধিকার চাওয়ার আর্তনাদ,
তা ছয় দফার অগ্নিপরীক্ষায় হয়ে ওঠে জাগরণের দীপ্ত মানচিত্র।
ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা প্রান্তরে সে কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো,
একাত্তরের রক্তভেজা ভোরে আঁকে স্বাধীনতার জ্বলন্ত সূর্যোদয়।
তিনি ছিলেন সেই সময়ের সাহসী সহযাত্রী—
যাদের পদচিহ্নে কেঁপে উঠেছিল শৃঙ্খলের লৌহদরজা,
যাদের বুকের স্পন্দনে জন্ম নিয়েছিল নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন।
স্বাধীনতার পর
ধ্বংসস্তূপের বুক ভেদ করে যখন বাংলাদেশ আবার মাথা তোলে,
তিনি ছিলেন সেই নির্মাণযাত্রার দৃঢ় অথচ নীরব কাণ্ডারি।
কিন্তু সময়—সে তো থেমে থাকে না—
সে প্রতিটি মুখে এঁকে দেয় ভাঙা বাস্তবতার কঠিন রেখা।
রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত,
অভিযোগের ভারী চাপ,
সন্দেহের ঘন অন্ধকার—
ধীরে ধীরে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী যাত্রাকে ঢেকে ফেলে অস্থির এক আবহ।
যে মানুষ একদিন ইতিহাসের বজ্রধ্বনির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন,
শেষ প্রান্তে এসে তিনি দাঁড়ান
নিঃশব্দ সময়ের ভারে নত এক ক্লান্ত প্রতিচ্ছবির সামনে।
শেষ যাত্রার দিনে
ধানমন্ডির আকাশ নেমে আসে গভীর শোকের ভারে—
বাতাসও যেন থেমে যায়, কাঁপে নীরবতার বুকে।
মানুষ আসে শ্রদ্ধার স্রোত হয়ে—
চোখের গভীরে জমে থাকা স্মৃতিকে নিয়ে শেষ প্রণাম জানাতে।
সহযোদ্ধাদের কণ্ঠে জ্বলে ওঠে স্মৃতির অগ্নিস্ফুলিঙ্গ—
“জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”—
মুহূর্তে মনে হয়,
ইতিহাস যেন আবার শ্বাস নেয় নিজের জন্মভূমিতে।
কিন্তু সেই নীরবতার বুকেই
ফেটে পড়ে বাস্তবতার তীব্র ভাঙন—
লাঠির শব্দ, দৌড়ে পালানো ছায়া,
শোকের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিরতার কম্পন।
শেষ বিদায়ের পবিত্র মুহূর্তে
নীরবতার পাশে জন্ম নেয় এক অনুচ্চারিত কাঁপন,
ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়ায় বিস্ময় আর বেদনার মাঝখানে।
শ্রদ্ধার সেই পবিত্র প্রাঙ্গণেও
মিশে যায় বাস্তবতার অস্থির কোলাহল—
যেখানে বিদায় হওয়ার কথা ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ, অবনত—
সেখানে সময় দাঁড়ায় ভাঙা হৃদয়ের ভার নিয়ে।
এর মাঝেই ভেসে আসে এক সংবাদ—
যা শেষ শ্রদ্ধার মুহূর্তকে করে তোলে আরও ভারী, আরও তীক্ষ্ণ, আরও বেদনাবিদ্ধ।
যে সময় হওয়ার কথা ছিল
শুধু শ্রদ্ধা, নীরবতা আর শেষ বিদায়ের কোমল স্থিরতা—
তা রূপ নেয় এক গভীর বেদনার অস্থির অভিজ্ঞতায়।
তবু কিছু মানুষ শেষ হয় না—
তারা মাটির সীমা ছাড়িয়ে বেঁচে থাকে সময়ের রক্তস্রোতে।
তারা হারায় না, তারা রূপ নেয় চিরজাগ্রত স্মৃতির আগুনে।
আজও তিনি আছেন—
ঊনসত্তরের উত্তাল রাজপথে,
একাত্তরের অগ্নিগর্ভ ভোরে,
স্বাধীনতার নির্মাণপর্বে,
আর জাতির প্রতিটি বাঁকবদলের নীরব ইতিহাসে।
তিনি কেবল একটি নাম নন—
তিনি এক চলমান প্রতিধ্বনি,
এক জ্বলন্ত ইতিহাস,
যা সময়ের বুক চিরে বয়ে চলে অবিরাম, অদম্য, অমর প্রবাহের মতো।
কবি পরিচিতি
কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু সমকালীন বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র, সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতায় অবহেলিত, বঞ্চিত ও শ্রমজীবী মানুষের নীরব আর্তনাদ যেমন গভীরভাবে উঠে আসে, তেমনি অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ মানবিক প্রতিবাদ রূপক ও চিত্রকল্পে প্রকাশ পায়।
সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী শব্দচয়নে তিনি সমাজ বাস্তবতার কঠিন সত্যকে কাব্যিকভাবে তুলে ধরেন। মানবতা, সত্যনিষ্ঠা ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই তাঁর লেখনীর মূল শক্তি।সমকালীন কবিতার ভুবনে তিনি ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র প্রতিবাদী কাব্যভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করছেন।এক কথায়, তিনি নীরব বঞ্চনার মুখে উচ্চারিত এক দৃঢ় কাব্যকণ্ঠ।
