প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু: আমার কিছু অনুভূতির প্রকাশ
২০২৬ জুন ০৩ ১৮:৪২:০৯
আবদুল হামিদ মাহবুব
মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু অনেক সময় মৃত্যুর পরই একজন মানুষকে নিয়ে নতুন বিতর্কের শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। বরং দিন দিন এটি যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, সেটিও সেই পুরোনো বাস্তবতারই নতুন সংস্করণ।
কেউ শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ তার রাজনৈতিক জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ এমন ভাষায় সমালোচনা করেছেন, যা একজন মৃত মানুষকে নিয়ে সভ্য সমাজে প্রত্যাশিত নয়।
একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর আমরা আসলে কী বিচার করি? তার পুরো জীবনকে, নাকি জীবনের শেষ কয়েকটি অধ্যায়কে? এইসব প্রশ্ন আমি কাকে করছি? করছি নিজেকে। নিজের বিবেককে। উত্তরটা আমাকেই দিতে হবে। আমার কাছে উত্তরগুলো এমন; মানুষ ভুল করে। ভুল-শুদ্ধ নিয়েই মানুষের জীবন। পৃথিবীর কোনো রাজনীতিবিদের জীবনই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ। এখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, আন্দোলন, দলীয় বাস্তবতা, রাষ্ট্রের চাপ এবং সময়ের দাবি। ফলে রাজনৈতিক জীবনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
তবে একটি বিষয়ও সত্য। একজন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন করতে হলে তার অবদান, প্রেক্ষাপট এবং সময়কে একসঙ্গে দেখতে হয়। শুধু পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা যায় না। আমি এখানে ইতিহাসও লিখছি না। আমি কেবল তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কিছু মনের কথা তুলে ধরছি।
তোফায়েল আহমদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি শুধু একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। ওই সময়ের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি ছিলেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি বড় বাঁক। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা ছিল, সেখানে তোফায়েল আহমদ ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক।
স্বাধীনতার আগে তার ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। বিতর্ক আছে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে। কিন্তু এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা প্রায়ই একজন মানুষের পুরো জীবনকে একটি মাত্র ঘটনার মধ্যে আটকে ফেলি। আবার কখনো একটি ভুল দিয়ে সব অর্জন মুছে ফেলতে চাই। অন্যদিকে একটি ভালো কাজ দিয়ে সব ভুলও ক্ষমা করে দিতে চাই। দুটিই চরমপন্থা।
একজন মানুষ একই সঙ্গে অবদানও রাখতে পারেন, আবার ভুলও করতে পারেন। ইতিহাসের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষই এমন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি বড় সংকট হলো প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করার প্রবণতা। এখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়। ফলে মৃত্যুর পরও বিরোধ শেষ হয় না।
বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকে। তীব্র মতভেদও থাকে। কিন্তু একজন মানুষ মারা গেলে তার অবদানকে সম্মান করার একটি সংস্কৃতি রয়েছে। সমালোচনা তখনও হয়, কিন্তু তা হয় তথ্যের ভিত্তিতে, শালীন ভাষায়। বাংলাদেশে আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।
এর একটি কারণ গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরও আমরা গণতন্ত্রকে পুরোপুরি একটি সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারিনি। নির্বাচন হয়েছে। সরকার বদল হয়েছে। আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু সহনশীলতা খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজনৈতিক মতভেদকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আগে কোনো মন্তব্য একটি নির্দিষ্ট আড্ডা বা পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একটি পোস্ট কয়েক মিনিটেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তথ্যের সঙ্গে গুজবও ছড়ায়। সত্যের সঙ্গে মিথ্যাও হাঁটে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় যাচাই করার প্রয়োজনও অনুভব করি না। একটি পোস্ট দেখলাম। সেটি আমাদের পছন্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করে দিলাম। যেন তথ্য নয়, অনুভূতিই সত্যের একমাত্র মানদণ্ড। ফলে একজন মৃত মানুষকে নিয়েও অসংখ্য অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে।
তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও আমাদের সামনে সেই প্রশ্ন তুলেছে; আমরা কি ইতিহাসকে পড়ছি, নাকি শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি?
একজন রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে। গণতন্ত্রে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা আর কুৎসা এক জিনিস নয়। মতভেদ আর বিদ্বেষও এক নয়। একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তার জীবনকে সম্পূর্ণ দেখতে হবে। কোথায় তিনি সফল ছিলেন, কোথায় ব্যর্থ ছিলেন, কী অবদান রেখেছেন, কী ভুল করেছেন—সবকিছুই আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে।
কারণ ইতিহাস প্রতিশোধের জায়গা নয়। ইতিহাস বিচার করে সময়, প্রেক্ষাপট এবং কাজকে। আজ তোফায়েল আহমদ নেই। তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও থাকবে। সমর্থকরা তার অর্জনের কথা বলবেন। সমালোচকরা তার সীমাবদ্ধতার কথা তুলবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে তার একটি অধ্যায় রয়েছে। সেই অধ্যায় মুছে ফেলা যাবে না। যেমন তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও মুছে ফেলা যাবে না।
সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মানুষকে সাদা বা কালো রঙে দেখে না। তারা দেখে পূর্ণ মানুষ হিসেবে। গুণ ও সীমাবদ্ধতার সমন্বয়ে। আমাদেরও সেই শিক্ষা দরকার। কারণ আজ আমরা তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কথা বলছি। কাল অন্য কাউকে নিয়ে বলব। একদিন আমাদের নিজেদের জীবনও অন্যরা মূল্যায়ন করবে।
সেদিন আমরা কী চাইব? আমাদের ভুলগুলোই শুধু মনে রাখা হোক, নাকি আমাদের ভালো কাজগুলোকেও স্মরণ করা হোক? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বলে দেবে আমরা কতটা সভ্য হয়েছি।
তোফায়েল আহমদের মৃত্যু তাই শুধু একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়। এটি আমাদের সমাজের সামনে ধরা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা একজন মানুষকে যতটা দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখি নিজেদের। প্রশ্ন এখন একটাই; আমরা কি সেই আয়নায় তাকানোর সাহস রাখি?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
