ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

হায় মা! হায় বাবা!

২০২৬ জুন ০৪ ১৮:১৪:২৯
হায় মা! হায় বাবা!

আবদুল হামিদ মাহবুব


মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙতে হয়নি। তবে ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। পুলিশ এসে যখন দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল, তখন ঘরের বাতাসে জীবনের কোনো চিহ্ন ছিল না। ছিল শুধু পচনের গন্ধ, জমে থাকা নীরবতা আর এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার অসহায়তা।

একজন মা পড়ে ছিলেন বিছানায়। ৭২ বছরের একটি জীবন। একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস। একটি সংসারের ভিত্তি। কয়েকদিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অথচ কেউ জানেনি। কেউ খেয়াল করেনি। কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ জিজ্ঞেস করেনি— মা, তুমি খেয়েছো? এই একটি প্রশ্নের জন্য পৃথিবীর কোনো মা কখনো বেশি কিছু চান না।কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটুকুও তিনি পাননি।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় মৃত্যুর খবর না। কষ্ট দেয় মৃত্যুর আগের নিঃসঙ্গতাটা। ভাবুন তো, একজন মানুষ মৃত্যুর আগে কতক্ষণ একা ছিলেন? কতদিন কারো অপেক্ষায় ছিলেন? কতবার দরজার দিকে তাকিয়েছেন? কতবার ভেবেছেন, আজ হয়তো ছেলে ফোন করবে। আজ হয়তো মেয়ে এসে একটু বসবে। আজ হয়তো কেউ জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছি। কিন্তু সেই ‘আজ’ আর আসেনি।

আমরা প্রায়ই ভাবি, বৃদ্ধ মানুষদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ওষুধ। এটা ভুল। তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষ। একটু কথা। একটু সময়। একটা স্পর্শ। একটা খোঁজ। একটা উপস্থিতি। কারণ বার্ধক্যে শরীরের ব্যথার চেয়ে একাকীত্বের ব্যথা অনেক বেশি গভীর।

সন্তানদের জীবনে সাফল্যের শেষ নেই। কেউ বড় কর্মকর্তা। কেউ শিক্ষক। কেউ ব্যবসায়ী। কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তাদের নাম আছে। সম্মান আছে। পরিচিতি আছে। সামাজিক মর্যাদা আছে।শুধু একটা জিনিস নেই। সেই মানুষটার জন্য সময় নেই, যার কাঁধে দাঁড়িয়ে তারা এত উঁচুতে উঠেছে।এ কেমন সাফল্য? যে সাফল্যের পথে হাঁটতে গিয়ে মানুষ নিজের মাকে হারিয়ে ফেলে, সেই সাফল্যের মূল্য কত? যে ডিগ্রি একজন মানুষকে মায়ের খবর নিতে শেখায় না, সেই শিক্ষার গর্ব কোথায়? যে পদমর্যাদা একজন মানুষকে বৃদ্ধ বাবার পাশে বসার সময় দেয় না, সেই পদবি আসলে কত বড়?

আজকাল আমরা সন্তানদের সবকিছু শেখাই।ইংরেজি শেখাই। কম্পিউটার শেখাই।প্রতিযোগিতায় জিততে শেখাই। ক্যারিয়ার গড়তে শেখাই। কিন্তু শেখাই না, বৃদ্ধ মায়ের কাঁপা হাত ধরে বসে থাকতে। শেখাই না, বাবার গল্প মন দিয়ে শুনতে। শেখাই না, একদিন যে মানুষগুলো দুর্বল হয়ে যাবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে।

আমরা শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি। মানুষ তৈরি করছি না। একজন মা যখন সন্তানকে বড় করেন, তখন তিনি কোনো হিসাব রাখেন না। রাত তিনটায় জ্বরের মাথায় কোলে তুলে বসে থাকা মা কখনো ভাবেন না, একদিন এই সন্তানের কাছ থেকে কী পাবেন। নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া মা কখনো কোনো প্রতিদান চান না। তিনি শুধু চান, সন্তানটা মানুষ হোক। কিন্তু কত ভয়ংকর।শেষ বয়সে সেই মা-ই কখনো কখনো সন্তানের জীবনে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় মানুষ হয়ে যান।ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো আসবাবের মতো।আছে। কিন্তু গুরুত্ব নেই। নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু উপস্থিতি অনুভূত হয় না। ফোনের কনট্যাক্ট লিস্টে নাম আছে। কিন্তু কল যায় না।

একই ছাদের নিচে থেকেও মানুষ কত দূরে চলে যেতে পারে, এই ঘটনা তার প্রমাণ। দেয়াল কখনো দূরত্ব তৈরি করে না। দূরত্ব তৈরি করে উদাসীনতা। একজন মা পাশের ঘরে ছিলেন। তবু তিনি একা ছিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর একাকীত্ব সম্ভবত এটাই। মানুষের ভিড়ে থেকেও কেউ না থাকা। একই বাড়িতে থেকেও কেউ খোঁজ না নেওয়া। জীবিত থেকেও অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।

আমরা প্রায়ই বৃদ্ধাশ্রমকে দোষ দিই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, অনেক বৃদ্ধাশ্রমের চেয়েও ভয়ংকর কিছু বাড়ি আছে। যেখানে বাবা-মা থাকেন ঠিকই।কিন্তু তাদের জন্য কারো সময় নেই। তাদের কথা শোনার মানুষ নেই। তাদের অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। একদিন এই পৃথিবীর প্রতিটি সন্তান বৃদ্ধ হবে।
প্রতিটি শক্ত হাত কাঁপবে। প্রতিটি দ্রুত পা ধীর হবে। প্রতিটি তীক্ষ্ণ চোখ ঝাপসা হবে। তখন বুঝবে, একাকীত্ব কত বড় শাস্তি। তখন হয়তো নিজের সন্তানের জন্য অপেক্ষা করবে। একটা ফোনের জন্য। একটা খোঁজের জন্য। একটা 'কেমন আছো?' শোনার জন্য।

জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মৃত্যু নয়।ট্র্যাজেডি হলো, মৃত্যুর আগে মানুষকে ভুলে যাওয়া। মৃত্যুর পর ফুল দেওয়া সহজ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করাও সহজ। কঠিন হলো জীবিত অবস্থায় পাশে থাকা। কঠিন হলো ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করা। কঠিন হলো মায়ের ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিট বসা। কঠিন হলো বাবার হাত ধরে বলা—আমি আছি।

আজ রাতেই যদি আপনার মা বেঁচে থাকেন, তাঁর ঘরে যান। বাবা বেঁচে থাকলে পাশে বসুন। কোনো বিশেষ কারণ লাগবে না। কোনো উপলক্ষ লাগবে না। শুধু গিয়ে বলুন—কেমন আছো? বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহারগুলোর একটি এই প্রশ্ন। কারণ একদিন হয়তো সেই ঘর খালি হয়ে যাবে। সেই চেয়ারটা খালি থাকবে। সেই কণ্ঠস্বরটা আর শোনা যাবে না। তখন হাজার ব্যস্ততা, হাজার সাফল্য, হাজার পদবি দিয়েও আর একটা উত্তর শোনা যাবে না—আমি ভালো আছি বাবা। আর তখন বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন সারাজীবন রক্তক্ষরণ করাবে; কেন একটু সময় দিলাম না?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।