ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শিশুশ্রম নিরসনে সরকারি ও সামাজিক সমন্বিত উদ্যোগ

২০২৬ জুন ১৩ ১৭:৫৭:১৮
শিশুশ্রম নিরসনে সরকারি ও সামাজিক সমন্বিত উদ্যোগ

ওয়াজেদুর রহমান কনক


বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (ILO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬০ মিলিয়ন শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বিপজ্জনক কাজে জড়িত। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ড্রপ-আউট বা ঝরে পড়ার হার শিশুশ্রমের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর পরিবার চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার উচ্চবিত্ত পরিবারের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশি। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় ড্রপ-আউট হওয়া শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এছাড়া কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী ড্রপ-আউটের হার প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে, যা শিশুশ্রম বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এই ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই শারীরিক ও মানসিক শোষণের শিকার হয়, যা তাদের ভবিষ্যতের কর্মদক্ষতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে এই ড্রপ-আউট হার ২০ শতাংশ কমাতে পারলে শিশুশ্রমের হার অন্তত ১৫ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।

শিশুশ্রম নিরসন কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বর্তমান বিশ্বে শিশুশ্রমের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শিশুদের ঝরে পড়া বা ড্রপ-আউট হওয়ার প্রবণতা। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কাঠামোর অকার্যকারিতা এই ড্রপ-আউট হারের পেছনে এমন এক জটিল জাল বিস্তার করে আছে, যা ভাঙা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে এই চক্রব্যূহ ছিন্ন করতে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া শিশুদের জীবনের মানচিত্র দ্রুতই শ্রম বাজারের দিকে মোড় নেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ড্রপ-আউট হওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ কৃষিকাজ, গৃহশ্রম, ইটভাটা বা অনানুষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত হয়। গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্টসমূহে দেখা গেছে, যেসব শিশুর পরিবার অত্যন্ত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের ক্ষেত্রে ঝরে পড়ার হার উচ্চতর। ড্রপ-আউটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবারের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদ্যালয়ের দূরত্বের সমস্যা, শিক্ষার গুণগত মানের অভাব এবং মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের উচ্চ ঝুঁকি। যখন একটি শিশু বিদ্যালয় ত্যাগ করে, তখন সে কেবল জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হারায় না, বরং সে সমাজ ও রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল মানবসম্পদ হওয়ার পরিবর্তে শোষণের শিকার হিসেবে চিহ্নিত হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এবং শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ নীতি অন্যতম। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছে না। উপবৃত্তি কর্মসূচি বা স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামের মতো সরকারি উদ্যোগগুলো ড্রপ-আউট কমাতে ভূমিকা রাখছে বটে, তবে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এই সহায়তা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। কার্যকর সরকারি উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন এমন এক সমন্বিত ডেটাবেস, যা প্রতিটি ঝরে পড়া শিশুকে চিহ্নিত করে তাদের পুনরায় শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা দেবে।

শিশুর শৈশব রক্ষা করা কোনো একক ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা বলতে কেবল দান-দক্ষিণা নয়, বরং কমিউনিটি-বেসড মনিটরিং সিস্টেম গড়ে তোলাকে বোঝায়। স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, অভিভাবক এবং তরুণ সমাজকে নিয়ে চাইল্ড প্রোটেকশন কমিটি গঠন করলে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা সহজ হয়। যখন একটি সমাজ তার এলাকার প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকারকে নিজেদের মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করে, তখন সেখানে শিশুশ্রমের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কর্মসূচির আওতায় ড্রপ-আউট শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের শ্রমবাজারের শোষণের হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

শিশুশ্রম নিরসনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় একটি অবিচ্ছিন্ন কাঠামোর দাবি রাখে। গবেষণায় দেখা যায়, যে সব এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে কাজ করেছে, সেখানে ড্রপ-আউটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই লক্ষ অর্জনে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ইউনিক আইডি প্রদান করে তাদের ঝরে পড়ার হার ট্র্যাক করা এবং তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে যে সব পরিবার দারিদ্র্যের কারণে শিশুকে শ্রমে পাঠাতে বাধ্য হয়, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা বিকল্প আয়বর্ধক প্রকল্পের সাথে শিক্ষাকে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া ড্রপ-আউট হওয়া শিশুদের জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিশুশ্রমের অপকারিতা ও শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী সুফল সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালানো অত্যন্ত জরুরি।

শিশুশ্রম নিরসনের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ড্রপ-আউট প্রতিরোধের মধ্যে। যখন আমরা একটি শিশুকে শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখতে পারি, তখন আমরা সমাজকে একটি দক্ষ কর্মী উপহার দিই এবং শোষণের একটি নতুন পথ বন্ধ করি। সরকারি আইন, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের সচেতন দায়বদ্ধতা—এই তিনের মিলনস্থলে শিশুশ্রমমুক্ত একটি উন্নত সমাজ গঠিত হতে পারে। এটি কেবল একটি পলিসি বা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি পবিত্র দায়বদ্ধতা। পরিসংখ্যান আমাদের দিকনির্দেশনা দেয়, কিন্তু উদ্যোগ ও সংবেদনশীলতা দেয় সমাধানের পথ। আসুন, ঝরে পড়া প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে এনে আমরা আগামীর বাংলাদেশ ও বিশ্বকে সমৃদ্ধ করি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।