প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
ব্যাংক হিসাবে টিআইএন, প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা
২০২৬ জুন ১৩ ১৮:১৮:২৩
আবদুল হামিদ মাহবুব
সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে। ধৈর্য না থাকায় টেলিভিশনের সামনে বসে পুরো বাজেট শোনা আমার সম্ভব হয়নি।সেই কারণে পত্রিকায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাজেটটি বোঝার চেষ্টা করছি। একটি জাতীয় দৈনিকে ছোট একটি শিরোনামে চোখ আটকে গেল। শিরোনামটি হচ্ছে 'ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক'।
বাজেট পেশের পর সেটা নিয়েই এখন সারাদেশে আলোচনা চলছে। প্রতি বছরই বাজেট আসে। নতুন নতুন প্রস্তাবও আসে। কিছু প্রস্তাব সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে। কিছু প্রস্তাব আবার অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় হয়। এবারের বাজেটে 'ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক' এমন যে প্রস্তাব এসেছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।
টিআইএন বা ট্যাক্সপেয়ারস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর মূলত কর প্রশাসনের একটি পরিচয় নম্বর। একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। সরকারের যুক্তি হলো, অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং করের আওতা বৃদ্ধি করা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব বৃদ্ধি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজস্ব ছাড়া উন্নয়নের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তব জীবনে এর প্রভাব কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শহরের বড় ব্যবসায়ী বা উচ্চ আয়ের মানুষের দিকে তাকালে হবে না। তাকাতে হবে গ্রামের সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষের দিকে।
আমার সাংবাদিকতা জীবনে এমন অনেক মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে, যাদের কাছে টিআইএন শব্দটিই অপরিচিত। তারা জানেন না এটি কী, কেন লাগে, কোথায় করতে হয় কিংবা এর সঙ্গে রিটার্নের সম্পর্ক কী। অথচ প্রশাসনিক কোনো প্রক্রিয়ায় যখন টিআইএন বাধ্যতামূলক হয়, তখন তারাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন।
কয়েক বছর আগে এক গৃহকর্মীর একটি ঘটনা আমাকে ভাবিয়েছিল। স্বামী মারা গেছেন। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে দীর্ঘ দেনদরবারের পর সামান্য কিছু জমি নিজের নামে আনতে পেরেছিলেন। পরে ছেলের কর্মসংস্থানের জন্য সেই জমির একটি অংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় তাকে জানানো হয়, যেহেতু তার জমে পৌরা এলাকার ভেতরে, সে কারণে টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলসহ প্রয়োজনীয় কর-সংক্রান্ত কাগজপত্র ছাড়া জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কাজ হবে না। তিনি কিছুই বুঝতেন না। কোথায় যাবেন, কী করবেন, সেটাও জানতেন না। পরে বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় কাজটি সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এতে সময়, অর্থ এবং মানসিক চাপ; সবই বেড়েছিল।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার। আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের সময় যে প্রক্রিয়া একজন শিক্ষিত নাগরিকের কাছে সহজ মনে হতে পারে, সেটি একজন স্বল্পশিক্ষিত বা দরিদ্র মানুষের কাছে অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ আছেন, যাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা সীমিত। অনেকেই সামান্য সঞ্চয় করেন। কেউ জমি বিক্রি করে টাকা ব্যাংকে রাখতে চান। কেউ সন্তানকে বিদেশ পাঠানোর জন্য টাকা জমা রাখেন। কেউ আবার নিরাপত্তার কারণে নগদের বদলে ব্যাংকে অর্থ রাখতে আগ্রহী হন।
রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ব্যাংকমুখী করার চেষ্টা করছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নানা কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আনা।এখন যদি ব্যাংক হিসাব খোলার প্রাথমিক ধাপেই অতিরিক্ত কাগজপত্র বা প্রশাসনিক জটিলতার অনুভূতি তৈরি হয়, তাহলে কিছু মানুষ নিরুৎসাহিত হতে পারেন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার ব্যাংকে হিসাব খুলতে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ভীতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশেষ কিছু হিসাবের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী বা বিশেষ ধরনের স্বল্প আয়ের হিসাবধারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকতে পারে। এটি ইতিবাচক দিক।তবে বাস্তবতা হলো, সমাজে শুধু দরিদ্র ও ধনী মানুষ নেই। এর মাঝখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বহু মানুষ আছেন, যারা করদাতা নন, কিন্তু জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করতে চান। তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আরেকটি বিষয় হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর তারা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। অনেক প্রবাসী বহু বছর ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যদি নতুন নিয়ম কার্যকর হয়, তাহলে এর বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, তা পরিষ্কারভাবে জনগণকে জানানো প্রয়োজন। কারণ যেকোনো নতুন নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে মানুষ অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগে ভোগেন।
কর নেট সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে। উন্নত দেশগুলোতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা ট্যাক্স আইডি ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। অনেক দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে কর শনাক্তকরণ তথ্যের সম্পর্কও আছে। তবে সেখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সাধারণত অত্যন্ত সহজ, ডিজিটাল এবং দ্রুত। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিককে আলাদা করে কোনো দালাল, মধ্যস্থতাকারী বা পেশাজীবীর সহায়তা নিতে হয় না।
বাংলাদেশেও ডিজিটাল করব্যবস্থা চালু হয়েছে। অনলাইনে টিআইএন নিবন্ধন এবং রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু দেশের সব নাগরিক ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সমান দক্ষ নন। শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে।সুতরাং মূল প্রশ্ন টিআইএন বাধ্যতামূলক করা উচিত কি না, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রক্রিয়াটি কতটা সহজ হবে।
যদি একজন কৃষক, একজন গৃহকর্মী, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা একজন প্রবাসীর পরিবার কোনো অতিরিক্ত ভোগান্তি ছাড়াই টিআইএন সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে সমস্যা কম হবে। কিন্তু যদি এর জন্য বারবার অফিসে যেতে হয়, বিভিন্ন মানুষের দ্বারস্থ হতে হয় কিংবা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়বে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতির একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য থাকে। কিন্তু সেই নীতির একটি সামাজিক প্রভাবও থাকে। ভালো নীতি হলো সেটি, যা রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও কমায়।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা স্বাভাবিক। কিন্তু কর প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি মনে করেন যে প্রক্রিয়াটি সহজ, স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত, তাহলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবেন। বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। তাই নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে তার সামাজিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার।
প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণের বড় বড় আলোচনায় স্থান পায় না। কিন্তু বাস্তব জীবনকে বুঝতে হলে সেই অভিজ্ঞতাগুলোও শুনতে হবে। টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে। রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনও বাস্তব। তবে সেই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ নতুন কোনো অযৌক্তিক জটিলতার মুখোমুখি না হন।
নীতিনির্ধারকদের কাছে হয়তো সব তথ্য আছে। তারা নিশ্চয়ই বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন। তারপরও মাঠপর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে নিয়মগুলো সময়ে সময়ে পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ একটি নীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে, সেটি সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা কার্যকর এবং কতটা গ্রহণযোগ্য তার ওপর।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
