ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » আইন আদালত » বিস্তারিত

‘বেনজীরের সফল প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর’

২০২৬ জুন ১৫ ১৪:৩৪:১৫
‘বেনজীরের সফল প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর’

স্টাফ রিপোর্টার : সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দেশে সফল প্রত্যর্পণ তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। ওই তিনটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির।

সোমবার (১৫ জুন) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এ বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন শিশির মনির।

‘বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া: একটি সারসংক্ষেপ’ শিরোনামে শিশির মনিরের লেখাটি নিচে তুলে ধরা হলো-
১। সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় বিচার করতে আগ্রহী।

২। প্রথমত, এটি উল্লেখযোগ্য যে বাংলাদেশ ও ইউএই (UAE)-এর মধ্যে বর্তমানে কোনো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক Extradition Treaty (প্রত্যর্পণ চুক্তি) নেই। তবে ২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও ইউএই-এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি (legal framework) তৈরি করে। এই চুক্তিগুলো হলো— (১) Agreement on Security Cooperation (নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি) (২) Agreement on Transfer of Sentenced Prisoners (দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের স্থানান্তর সংক্রান্ত চুক্তি)। (সূত্র দ্য ডেইলি স্টার, ২৭ অক্টোবর ২০১৪)

৩। উক্ত Agreement on Security Cooperation এর আওতায় বাংলাদেশ ও ইউএই সন্ত্রাসবাদ দমন, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, মানবপাচার রোধ, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান এবং জনশক্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রতিরোধে সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত হয়।

৪। অন্যদিকে, Agreement on Transfer of Sentenced Prisoners এর উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তাদের নিজ দেশের কারাগারে সাজা ভোগের সুযোগ প্রদান করা। কোনো বাংলাদেশি যদি ইউএই-এর কোনো আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হন, তাহলে তিনি বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হয়ে তার সাজা ভোগ করতে পারবেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবেন না। স্থানান্তরের পর এসব বন্দি তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সহজে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। চুক্তি অনুযায়ী, বন্দিদের প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত ব্যয় দুই দেশ যৌথভাবে বহন করতে পারবে।

৫। যদিও এসব চুক্তি সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি(Extradition Treaty) নয়, তবুও এটি দুই দেশের বিচারিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তার ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করে। তাছাড়া, The Extradition Act, 1974 এর সেকশন ৩ অনুযায়ী যদি বাংলাদেশের সাথে কোনো দেশের Extradition Treaty (প্রত্যর্পণ চুক্তি) থাকে, তাহলে সেই দেশকে সরকার ‘Treaty State’ হিসেবে ঘোষণা করবে এবং উক্ত চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী অপরাধী আদান-প্রদান করা যাবে। আর সেকশন ৪ অনুযায়ী যদি কোনো দেশের সাথে প্রত্যর্পণ চুক্তি না-ও থাকে, তবুও সরকার চাইলে সেই দেশের সাথে উক্ত আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ করতে পারবে।

৬। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহুদ্দিন আহমদ সংসদে তার বক্তব্যে বলেছেন, UAE Federal Law No. 39 of 2026 এর অধীনে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন (Formal Extradition Request) পাঠাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সেটি ইউএই কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (NCB) ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করবে।

সাধারণত প্রত্যর্পণ আবেদনে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী নথিপত্র উপস্থাপন করতে হয়। যেমন - আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এফআইআর (FIR), চার্জশিট অথবা তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ , অভিযুক্তের পরিচয় ও নাগরিকত্বের তথ্য, অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ, প্রাসঙ্গিক আইন ও শাস্তির বিধান, আদালতের আদেশ, প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি, অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার বা দুর্নীতির অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণাদি।

প্রত্যর্পণ আবেদনের পর ইউএই (UAE) ‘র আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা করতে পারে। প্রথমত, অভিযোগকৃত অপরাধগুলো ইউএই’র আইনেও অপরাধ কি না। এই নীতিকে বলা হয় Dual Criminality। দ্বিতীয়ত, আদালত পরীক্ষা করতে পারে মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে যে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নয়; বরং একটি বৈধ ও স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে দেখাতে হবে যে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তিনি ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিচার পাবেন এবং তার মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

৭। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ পাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা পাওয়ায় সফল প্রত্যর্পণও সম্ভব হয়েছে।

উদাহরণস্বরুপ, ইন্টারপোল রেড নোটিশের মাধ্যমে প্রত্যর্পণের একটি সফল উদাহরণ হলো নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা মো. হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলা। পিবিআই কর্তৃক মামলাটি তদন্তের সময় আসামি আরিফ সরকার ও মুহসীন মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং পরবর্তীতে ইন্টারপোলের সহায়তায় রেড নোটিশ জারি করা হয়। এরপর গত বছরের জুলাই মাসে প্রথমে মোহসিন মিয়াকে দুবাই থেকে ইন্টারপোলের সহায়তায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তার দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আসামি আরিফ সরকারের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পরে ইন্টারপোল রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ আরিফ সরকারকে গ্রেপ্তার করে এবং বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায়। এরপর বাংলাদেশ পুলিশ ও পিবিআইয়ের একটি স্পেশাল টিম তাকে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনে। দেশে পৌঁছানোর পর তাকে মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। (তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ০৭ মে ২০২৬। প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০২৬)

৮। তাই, পরিশেষে বলা যায় যে, আসামি বেনজীর আহমেদের সফল প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর - (ক) নিখুঁত ও শক্তিশালী আইনি নথিপত্র, (খ) অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং (গ) ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা। এই তিনটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হলে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার সম্ভব হবে।

(ওএস/এএস/১৫ জুন, ২০২৬)