ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

রৌমারী সীমান্ত

শূন্যরেখায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে ৯ বাংলাভাষীর মানবেতর জীবন

২০২৬ জুন ১৭ ১৯:২৮:০৮
শূন্যরেখায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে ৯ বাংলাভাষীর মানবেতর জীবন

পিএম সৈকত, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে মানবিক সংকট যেন আরও গভীর হচ্ছে। বিএসএফের পুশইনের চেষ্টার শিকার হয়ে ৬ মাস বয়সী এক শিশুসহ ৯ জন টানা প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

তীব্র রোদ, খোলা আকাশ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। মাথার ওপর সামান্য একটি প্লাস্টিকই এখন তাদের একমাত্র আশ্রয়। শিশুটির সঙ্গে রয়েছে আরও একটি ছোট শিশু। সীমান্তের ১০৬০ নম্বর পিলারের কাছে নির্জন স্থানে আটকে থাকা এসব মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের কোনো ব্যবস্থা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি নিষ্পাপ শিশুসহ নারী ও শিশুদের এমন অবস্থায় আটকে রাখা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। শিশুদের দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সীমান্তবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

জানা গেছে, গত রবিবার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে কয়েকজনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি বাধা দিলে তারা শূন্যরেখা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেয়। ঘটনার পর অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকেও কোনো সমাধান হয়নি। গয়টাপাড়া সীমান্তে পুশইনের শিকার ছয়জনের মধ্যে ২ জন শিশু ১ জন নারী ও ২ জন পুরুষ।

পুশইনের শিকার সুমি আক্তার বলেন, গত তিনদিন ধইরা আমরা এই গরমের মধ্যে এই জায়গাটায় আছি। কোলে ৬ মাসের একজন ও ৪ বছরের বাচ্ছা রইছে। খাবার নাই, পানি নাই, মাথার উপর ছাদ নাই। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে, কিছুই খাবার দিতে পারতেছিনা। অনেকে বিস্কুট রুটি দিতাছে তাই দিয়ে ক্ষুধা মিটাইতাছি।

সুমি আক্তার আরও জানান, ২৭দিন আগে সিলেট দিয়া বাবা-মাসহ কাজের সন্ধানে অবৈধপথে ভারত যাই। ইন্ডিয়ান পুলিশ টের পাইয়া আমাগো বিএসএফর হাতে তুইলা দেয়। এখন আমাগো কেউ লইতাছে না।

সুমির স্বামী বেলাল জানান, ছোট পোলাপান লইয়া খুব দুর্ভোগে পইরা আছি। পানি নাই, পায়খানা নাই, বউ ছাওয়াল নিয়া খুব অসুবিধায় আছি। দিনের বেলা প্রচন্ড গরমে বাচ্চা দুইডা অসুস্থ হয়া রইছে। জীবনে অনেক বড় ভুল করছি, বাঁচি থাইকলে এই কাজ আর করুম না। আমাগো বাঁচান।

গয়টা পাড়া সীমান্ত দিয়ে পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা দাবী করেন, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা।

এদিকে রবিবার (১৪ জুন) সকালে বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে কোম্পানি পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ পুশইনের ঘটনাটি অস্বীকার করায় বৈঠকটি সমাধান ছাড়াই ব্যর্থ হয়। বিজিবি অবৈধ পুশইন বন্ধ করে শুণ্য রেখায় অবস্থানরত ৯ জনকে ফিরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করলেও বিএসএফ ৩দিন গড়িয়ে গেলেও সেই ৯ নাগরিককে ফিরিয়ে নেননি।

গয়টা পাড়ার বাসিন্দা ছক্কু মিয়া বলেন, তিনদিন হয়ে গেল দুই দেশের কোন সরকারই তাদেরকে নিচ্ছে না। এরা চরম ঝুঁকির মধ্যে দিনরাত পাড় করছে। বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত পর্যায়ে আলাপ আলোচনা করে অসহায় বাচ্চা দুইটির মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।

রৌমারী শৌলমারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোনা মিয়া জানান, কোলের বাচ্চাসহ লোকগুলা খুব কষ্টে খোলা আকাশে দিনরাত পাড় করছে। গরমে ঘামে বাচ্চা দুটো কাঁনতেছে। ঠিক মতো খাবার নাই, পানি নাই, টয়লেটের ব্যবস্থা নাই, অন্ধকার রাতে সাপ বিচ্ছুর ভয়, মশার কামড়ে তাদের যায় যায় অবস্থা। বিএসএফও ফিরিয়ে নিচ্ছে না, সমাধান না হওয়ায় এই বাচ্চাগুলোর বড় একটা বিপদ হয়ে যেতে পারে।

জামালপুর ৩৫-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘উর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলমান রয়েছে।’

(পিএস/এসপি/জুন ১৭, ২০২৬)