ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

বেগম খালেদা রব্বানীকে দেখে এলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

২০২৬ জুন ১৮ ১৭:৩৯:২৬
বেগম খালেদা রব্বানীকে দেখে এলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আবদুল হামিদ মাহবুব


বেগম খালেদা রব্বানীর নাম মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুটাও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

সেই সময় তিনি অনেকটাই অবরোধবাসিনী ছিলেন। পুরুষদের সামনে খুব বেশি আসতেন না। তবে তিনি মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। মৌলভীবাজারের প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তখন থেকেই তৈরি হতে শুরু করে।

সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মৌলভীবাজারের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আবু জাফর আহমদ তখন সক্রিয় ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হন। একই সময়ে মসুদ আহমদ ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির সভাপতি।

এক পর্যায়ে মৌলভীবাজারে একটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। নারীদের সংগঠিত করে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু একটি বড় সমস্যা ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের মেয়েরা সামনে এলে পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নিতে পারত। তাই এমন একজন নারীকে খোঁজা হচ্ছিল যিনি সমাজে পরিচিত, গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির অধিকারী।

প্রথমে যোগাযোগ করা হয়েছিল মিসেস পি. বি. পাত্রের সঙ্গে। কিন্তু তিনি এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে রাজি হননি। এরপর সৈয়দ আবু জাফর আহমদ ও অন্যরা আলোচনা করে খালেদা রব্বানীর নাম প্রস্তাব করেন। কারণ তিনি মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় নারী সমাজে বেশ পরিচিত ছিলেন।

পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। তাঁকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় মৌলভীবাজার নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি। কমিটির সদস্য সচিব হন মসুদ আহমদ। এভাবেই শুরু হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ।

তখন মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন সাজ্জাদুর রহমান পুতুল। তাঁর কার্যালয়ের কক্ষেই কমিটির একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনেক তরুণ কর্মীও সেখানে যুক্ত ছিলেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে।

সেই সময় ঢাকাতেও নারী মুক্তি বা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে বড় ধরনের কোনো সংগঠন গড়ে ওঠেনি। মহিলা পরিষদ ছিলো বটে, তবে তেমন কর্মকাণ্ড ছিলো না। ফলে মৌলভীবাজারের এই উদ্যোগ ছিল সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর একটি পদক্ষেপ।বেগম খালেদা রব্বানী তখনও সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি মূলত সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন মৌলভীবাজার সফরে আসেন, তখন তাঁকে জনমিলন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় দেশে জাগদল গঠনের কার্যক্রম চলছিল। মৌলভীবাজারে অ্যাডভোকেট সৈয়দ আব্দুল মতিন, মাঈন উল ইসলামসহ আরও অনেকেই জাগদলের সঙ্গে যুক্ত হন। খালেদা রব্বানীও এই রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

জাগদল পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিতে রূপান্তরিত হয়। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেন। দল তাঁকে মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়। এরপর তাঁর রাজনৈতিক জীবন ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নারী নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে ওঠেন। তিনি একাধিকবার সংরক্ষিত নারী আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন বিদেশ সফরে তাঁকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। এটি দলের প্রতি তাঁর আস্থা ও গুরুত্বেরই প্রতিফলন ছিল।

মৌলভীবাজারের রাজনীতিতে খালেদা রব্বানীর প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে ছিল। তিনি শুধু দলীয় রাজনীতিতেই নয়, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক।

বর্তমানে তিনি অসুস্থ। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে আছেন। তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান এখনো মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

গত বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) মৌলভীবাজার জেলায় সরকারি প্রোগ্রাম শেষে জেলা শহরের শাহ মোস্তফা রোডস্থ বেগম খালেদা রব্বানীর বাসভবনে যান বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বেগম খালেদা রব্বানীর সাথে বেশ কিছুটা সময় কাটান এবং তাঁর চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। বেগম খালেদা রব্বানীর পরিবারের লোকজনের সাথেও তারেক রহমান কথা বলেন। তিনি তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। এ সময় তিনি খালেদা রব্বানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, দলীয় কর্মকাণ্ডে অবদান এবং জনকল্যাণমূলক কাজের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে খালেদা রব্বানীর অবদান দল ও জনগণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

একজন সামাজিক কর্মী থেকে রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার যে যাত্রা, খালেদা রব্বানীর জীবন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলনের আহ্বায়ক হিসেবে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে তাঁকে জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখে পরিণত করে। মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।