ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

শুধুমাত্র রাজাকারের উত্তরসূরিরা চৈতালির বিপক্ষে থাকবে

২০২৬ জুন ২৩ ১৯:১১:১১
শুধুমাত্র রাজাকারের উত্তরসূরিরা চৈতালির বিপক্ষে থাকবে

শিতাংশু গুহ


চৈতালির পক্ষে যদি দাঁড়াতে না চান, অন্তত: বিরোধিতা করবেন না, তিনি অসাংবিধানিক কিছু বলেননি! চৈতালি সবার মনের কথাটি বলছেন। চৈতালি বলেছেন, ‘আপনারা যদি বেশি বাড়াবাড়ি করেন, আমরা তাহলে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা বাংলাদেশের একটি প্রদেশ করবো শুধুমাত্র সনাতনীদের জন্য। আমরা কিন্তু সেটা চাই না। কিন্তু আপনারা যা করছেন, তাতে একসময় এরকমই হবে।সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ হয়ে যাবে’।

এই প্রদেশ দাবিটি কি নুতন? একদা জাসদ এটি দাবি করেছিলো, এরশাদ বাংলাদেশকে ৮টি প্রদেশে ভাগ করতে চেয়েছিলেন। এমনকি জুলাই-২৪ মৌলবাদী উত্থানের নায়করা ৪টি প্রদেশের কথা বলেছেন। এখনকার বিভাগকে ‘প্রদেশ’ ধরা যেতে পারে। আপনাদের অত্যাচারে হিন্দুদের জীবন ওষ্ঠাগত, তাঁরা দুইটি বিভাগে একত্রে থাকতে চাইলে বা থাকার দাবি জানালে কি খুব অন্যায় হবে? রাষ্ট্র যদি উগ্রবাদকে নিয়ন্ত্রণ না করে, বা সমর্থন যোগায় তাহলে পৃথক প্রদেশ দাবি কি খুব অযৌক্তিক?

এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ভগবান শ্রীরামের অবমাননা নিয়ে হিন্দুরা সারাদেশে আন্দোলন করছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামের মুর্ক্তি নির্মাণ বন্ধে তৌহিদী জনতার দাবি মেনে সরকার ঐমুর্ক্তি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। এর প্রতিবাদে হিন্দু সম্প্রদায় মাঠে নেমেছে। খবর হচ্ছে ২১শে জুন ২০২৬ পলাশবাড়ীতে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্ত মন্দিরে হামলা চালিয়ে নির্মাণাধীন কালীমন্দিরের ঢালাই ভেঙ্গে ফেলেছে। হাইকোর্টে মৌলবাদী উকিলরা চৈতালির ওপর হামলা করেছে।

চৈতালি কি বাংলদেশ বিরোধী কিছু বলেছেন? না, তিনি বাংলাদেশ বিরোধী কিছুই বলেছেন। তিনি বলেছেন: ‘হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধবেন না। দাঙ্গা বাঁধালে আপনারাও পার পাবেন না। আপনারা দুইটা মারবেন, আমরা একটা মারবো। কিন্তু আমরাও মারবো’। কি চমৎকার সাহসী উচ্চারণ, এবং এটাই কি হওয়া উচিত না? এতকাল হিন্দুরা তো শুধু মার খেয়েছে, এখন যদি তাঁরা আত্মরক্ষায় উঠে দাঁড়ায়, তাতে ক্ষতি কি? নারীর সন্মান, জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় দাঁড়ানো কি উচিত না?

মার খেতে খেতে হিন্দুর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে হিন্দু শুধু মার খেয়েছে। একটি বিড়ালকে ঘরের সবগুলো দরজা-জানালা বন্ধ করে মারতে চাইলে বিড়ালটি আত্মরক্ষায় পাল্টা আক্রমন করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের হিন্দু জেনে গেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, ভারত কেউ তাদের জন্যে কিচ্ছু করেনি, করবে না, তাই তারা ‘চাচা আপন বাঁচা’ থিওরি ধরেছে। কেউ চাইলেও হিন্দুদের খেদিয়ে দেয়া যাবেনা। সুতরাং, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ একমাত্র সমাধান।

সরকার বিনা কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আটকিয়ে রেখেছে, এতে হিন্দুরা রাগান্বিত। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস লক্ষ লক্ষ চৈতালি, হরিদাস সৃষ্টি করে গেছেন, কতজনকে ঠেকাবেন? এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ হিন্দু বা সংখ্যালঘু জেন-জি আন্দোলন দেখবে। ভয় নেই, এঁরা বাসে আগুন দেবেনা, পুলিশ হত্যা করবে না, বা গণভবন লুট করতে যাবেনা। তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে ধর্মান্ধ-মৌলবাদের ভীত কাঁপিয়ে দেবে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস হিন্দুদের বাঁচতে শিখিয়ে গেছে, এদের মারে সাধ্য কার?

ধর্মান্ধ-মৌলবাদীরা রামের ছবিতে ‘জুতা’ মেরেছে। প্রতিটি হিন্দুর প্রাণে এতে আঘাত লেগেছে। সরকার কিচ্ছু করেনি। শুধু চৈতালি এতে রাগেনি, রেগেছে বাংলাদেশের দুইকোটি হিন্দু। রেগেছে বিশ্বের আরো ১৩০ কোটি হিন্দু। এই রাগের বহি:প্রকাশ কিভাবে ঘটবে আমি জানিনা, শুধু জানি, রামের অবমাননা হিন্দুরা মেনে নেবে না। বাংলাদেশে রামের মুর্ক্তি হবে, প্রয়োজনে ৬৪ জেলায় হবে, রাম বাংলার, রাম বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বিদ্যমান, তাঁকে ঠেকায় সাধ্য কার?

চৈতালির পুরো বক্তব্য আমি শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘মসজিদ থাকার পরও আপনি যখন রাস্তায় নামাজ পড়েন, তখন কি আমরা কখনো বলেছি যে এই রাস্তায় নামাজ পড়া যাবে না? এই রাস্তাটা তো আমাদেরও। কিন্তু আমরা মানবিকতা দেখাই। আপনাদের মধ্যে কোন মানবিকতা নেই। আমার মন্দিরে, আমার বাড়িতে আমি কীভাবে আমার রাম দেবতাকে স্থাপন করবো, কত উঁচু করবো, এর কৈফিয়ত নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দেব না। আপনি কোথাকার ‘হরিদাস পাল’ যে আপনাকে এই কৈফিয়ত দিতে হবে’?

ব্রাভো, চৈতালি চক্রবর্তী। এমন সত্য কথা বলার জন্যে ধন্যবাদ। এসব তো উদার মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বলার কথা, তাঁরা বলেনা, কবি এখানে চুপ। তবে সাবধানে থাকবেন, ওঁরা গুপ্ত, অন্ধকারে ছুরি হাতে হয় উন্মুক্ত? কেউ কেউ আপনাকে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছে, তাঁদের বলি, ‘যেদেশে মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীর পশ্চাতে ডাক্তারের সেলাই দিতে হয়, যে মাদ্রাসায় ৪২জন ছাত্রীর সবার সাথে অধ্যক্ষ ঘুমান, সেদেশে আপনাদের তো লজ্জায় মুখ ঢাকা উচিত, চৈতালি নন, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলুন।

গ্রেফতার তো হওয়া উচিত যাঁরা রামের ছবিতে জুতা মেরেছে? সেটি হবেনা, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র সাম্প্রদায়িক। এদিকে লতিফা নামে এনসিপি’র এক কর্মী বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশে হিন্দুদের পূজা করতে দেবো না, প্রয়োজনে তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো’। এই নেত্রী কি গ্রেফতার হবেন? যারা পুলিশ হত্যা করেছে, ক্যান্টনমেন্ট উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে কুকুরের সাথে তুলনা করেছে, দেশকে বিক্রী করে দিয়েছে তারা কি গ্রেফতার হয়েছে? চৈতালি তো শুধুমাত্র একটি দাবির পক্ষে কথা বলেছেন!

সুস্মিতা সুমি এবং আরো কিছু তরুণ ছেলেমেয়ে অনেক সাহসী কথাবার্তা বলেছেন, এদের সবাইকে ধন্যবাদ। কতিপয় হিন্দু বলতে চাইছেন চৈতালি আওয়ামী লীগ নেত্রী। তাতে কি? চৈতালি কোন দল করেন সেটি বিষয় নয়, বাংলাদেশে মানুষ এখন শেখ হাসিনা’র পক্ষে কথা বলছে, এটি অপরাধ নয়? চৈতালি বা যেকেউ যেকোন দল করতে পারেন, কথা হচ্ছে চৈতালি স্বজাতি ও সত্যের পক্ষে কথা বলেছে। আপনি যখন এরচেয়েও সজোরে কথা বলতে পারবেন, তখন চৈতালির সমালোচনা করবেন।

দেখুন, গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরী বা হিন্দুট্রাস্টের বিজনবাবু’র মুখে কিন্তু কথা নেই? আওয়ামী লীগ আমলেও কিন্তু একই ব্যবস্থা ছিলো, সেক্ষেত্রে চৈতালি ব্যতিক্রম, নিয়ম ভাঙ্গুক। বিএনপি’র কোন নেত্রী এমন কথা বললে আরো খুশি হতাম। কথা হচ্ছে, আপনি যদি চৈতালির পক্ষে দাঁড়াতে সাহস না পান, চুপ থাকুন, তার বিরুদ্ধে মাঠ গরম করবেন না? কারণ শুধুমাত্র জামাত-এনসিপি-রাজাকার-পাকিস্তানীরাই চৈতালির বিপক্ষে যাবেন। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চিতালিকে সাহস জোগাবেন।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।