প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
মৌলভীবাজারে পৌরকর ২০ গুণ বৃদ্ধি!
২০২৬ জুন ২৪ ১৮:৩৫:১৪
আবদুল হামিদ মাহবুব
মৌলভীবাজার পৌর শহরের আরামবাগে আমাদের একটি পুরোনো বাসা রয়েছে। পাকিস্তান আমলে নির্মিত এই বাড়িটি শুধু একটি স্থাপনা নয়। এটি আমাদের পরিবারের স্মৃতি, ইতিহাস ও আবেগের অংশ। আমার পিতা ও চাচাদের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির সঙ্গে। বড় চাচা তখন লন্ডনে প্রবাসজীবন কাটাতেন। তাঁর উপার্জিত অর্থেই বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল। সে সময় পুরো শহরে পাকা বাড়ি ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। সেই কারণেই বাড়িটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কথা কখনো ভাবিনি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ পৌরসভার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। প্রতি বর্ষায় কয়েক দফা করে বাড়িতে পানি ওঠে। শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম কোদালিছড়া সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় বছরের পর বছর এই দুর্ভোগ চলেছে। অবশেষে বাধ্য হয়ে আমরা কয়েক বছর আগে বাড়িটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই।
সম্প্রতি সেই পরিত্যক্ত ও বসবাসের অযোগ্য বাড়ির জন্য একটি নতুন পৌরকর নির্ধারণের নোটিশ হাতে পেলাম। নোটিশ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। আগে আমার অংশের বার্ষিক পৌরকর ছিল ১ হাজার ৩২০ টাকা। এখন তা এক লাফে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি।
প্রশ্ন হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়ায় এই কর নির্ধারণ করা হয়েছে? আমার জানা মতে, নতুন করে কর নির্ধারণের আগে সম্পত্তির মালিককে নোটিশ দিতে হয়। এরপর সরেজমিনে ভবন পরিমাপ করা হয়। মালিক বা প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এসবের কিছুই ঘটেনি। আমি কোনো নোটিশ পাইনি। কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। তাহলে ভবন পরিমাপ হলো কীভাবে? কার উপস্থিতিতে হলো? কোন তথ্যের ভিত্তিতে হলো?
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, পৌরসভা আমার অংশের ভবনের আয়তন দেখিয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুট। অথচ আমাদের অংশের জমি মাত্র সাত শতকের মতো। সেখানে মূলত একটি পুরোনো টিনশেড কাঠামো এবং পরে নির্মিত কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে এই হিসাবের কোনো মিল নেই। আমার সন্দেহ, ভুলবশত কিংবা অবহেলার কারণে আমার চাচার বিক্রিত অংশও আমাদের অংশের সঙ্গে যুক্ত করে পরিমাপ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রায় আট বছর আগে আমার চাচা তাঁর অংশ অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। তাঁর নামে আলাদা হোল্ডিং ছিল। নতুন মালিকরাও নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় মালিকানা পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। তাহলে এই বিভ্রান্তি ঘটল কীভাবে? এই ভুলের দায় কার?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বর্তমানে মৌলভীবাজার পৌরসভায় কোনো নির্বাচিত মেয়র বা কাউন্সিলর নেই। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া এই নতুন কর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন? কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এটি কার্যকর করা হয়েছে? নাগরিকদের সঙ্গে কোনো গণশুনানি হয়েছে কি? কোনো মতবিনিময় সভা হয়েছে কি? পৌরবাসীর মতামত নেওয়া হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
এটা নিয়ে আমার ফেসবুক পোস্টের পর বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো শুধু আমিই এমন নোটিশ পেয়েছি। কিন্তু পোস্ট দেওয়ার পর একের পর এক পৌরবাসী ফোন করতে শুরু করেন। তাঁরা জানান, তাঁরাও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছেন।
এডভোকেট মাহবুবুল আলম রুহেল জানান, তাঁর পৌরকরও আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বাড়ানো হয়েছে। তিনি গত ১৬ জুন এ বিষয়ে কথা বলতে পৌরসভায় যান। কিন্তু সেখানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাননি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় পৌরসভার এমন অবস্থাই এখন বাস্তবতা। আরেক নাগরিক সৈয়দ তৌফিক আহমদ জানান, তাঁর একটি দোকানের করও কয়েক গুণ বাড়িয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'তাদের ইচ্ছামতো যা খুশি করুক, আমি আর পৌরকরই দেব না।'
আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেসের মালিক মুক্তাদির সাহেবও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানতে চান, আমার কর কত গুণ বেড়েছে। আমি পুরোনো করের কাগজ ও নতুন নোটিশের কপি তাঁকে পাঠাই। তিনি দেখেন, আমার ক্ষেত্রে প্রায় ২০ গুণ কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। গত ২২ জুন টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটির (টিএলসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তাদির সাহেব ওই কমিটির সদস্য। সভায় তিনি আমার বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে তিনি আমাকে জানান, সভায় প্রশাসক বলেছেন; যারা নোটিশ পেয়ে আপত্তি জানাচ্ছেন, তাঁদের কর কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। যদি কর কমিয়েই দেওয়া হবে, তাহলে প্রথমে এত বেশি কর ধার্য করা হলো কেন? এই নোটিশ কি বৈধ প্রক্রিয়ায় জারি করা হয়েছে? যদি আইন অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে আপত্তি করলেই তা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ কোথায়? এই বক্তব্য নিজেই পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মুক্তাদির সাহেবের কাছ থেকেই জানতে পারি, সাবেক পৌর কাউন্সিলর স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরীও ওই সভায় অভিযোগ করেছেন যে তাঁর বাড়ির করও কয়েক গুণ বাড়িয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সভায় বলেন, কর বাড়ানোর আগে মালিককে নোটিশ দিতে হয়। মালিকের সামনে ভবন পরিমাপ করতে হয়। স্বাক্ষর নিতে হয়। কিন্তু এসব কিছুই করা হয়নি। অফিসে বসেই কর বাড়িয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এতে নাগরিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সভায় উপস্থিত প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাকি এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি। যখন জবাব নেই, তখন প্রশ্ন আরও বেড়ে যায়।আমরা কি এমন এক প্রশাসনিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে নিয়ম-কানুনের চেয়ে কর্মকর্তাদের ইচ্ছাই বড় হয়ে উঠছে? নাগরিকদের মতামত, অধিকার এবং অংশগ্রহণ কি ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে?
পৌরকর বৃদ্ধি কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে কর বাড়তে পারে। সম্পত্তির মূল্য বাড়লে করও বাড়তে পারে। কিন্তু তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আইনসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। নাগরিককে জানাতে হবে। আপত্তির সুযোগ দিতে হবে। বাস্তব তথ্য যাচাই করতে হবে। কিন্তু যদি কোনো নোটিশ ছাড়া, কোনো পরিমাপ ছাড়া, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া এক লাফে কর ৫ গুণ, ১০ গুণ বা ২০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি নাগরিক সেবা নয়; বরং নাগরিক হয়রানির শামিল। আরও বড় প্রশ্ন হলো, যে পৌরসভা বছরের পর বছর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যে পৌরসভা নাগরিকদের সম্পদ রক্ষা করতে পারেনি, সেই পৌরসভা কী নৈতিক ভিত্তিতে এত বড় অঙ্কের কর দাবি করে?
কর আদায়ের অধিকার আছে। কিন্তু তার আগে দায়িত্ব পালনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। আমি মনে করি, বিষয়টি এখন শুধু আমার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি মৌলভীবাজার পৌরসভার হাজারো নাগরিকের উদ্বেগের বিষয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানাতে চাই। ০১.নতুন কর নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করতে হবে।০২. বিতর্কিত সব সম্পত্তি পুনরায় সরেজমিনে পরিমাপ করতে হবে। ০৩.কোনো কর্মকর্তা বা সার্ভেয়ারের গাফিলতি কিংবা অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ০৪. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকা অবস্থায় বিতর্কিত কর পুনর্মূল্যায়নের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হবে।
নাগরিকদের ওপর অযৌক্তিক করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু নাগরিকদের আস্থা অর্জন করা কঠিন। সেই আস্থা হারিয়ে গেলে প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।মৌলভীবাজার পৌরসভার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আজ পৌরবাসীর মধ্যে যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়া জরুরি। অন্যথায় মানুষের মনে এই ধারণাই আরও শক্ত হবে যে, নিয়মের চেয়ে ইচ্ছাই বড়, আর জবাবদিহিতার চেয়ে ক্ষমতাই মুখ্য।গণতান্ত্রিক সমাজে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য হতে পারে না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
