ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

প্রকৃতির চেনা অতিথি দোয়েল পাখি অস্তিত্ব সংকটে 

২০২৬ জুন ২৫ ১৪:৩৮:৩৫
প্রকৃতির চেনা অতিথি দোয়েল পাখি অস্তিত্ব সংকটে 

রূপক মুখার্জি, নড়াইল : বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল। শহরে কিংবা গ্রামে অতি পরিচিত পাখি হলো দোয়েল।

বাড়ির আঙিনা, বাগান, ঝোপঝাড় কিংবা গাছের ডালে চঞ্চল ভঙ্গিতে উড়ে বেড়ানো এই পাখির দেখা মিলত প্রায় সর্বত্র।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির এই পরিচিত অতিথি এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দোয়েলের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দোয়েলের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক আবাসস্থলের সংকট। একসময় গ্রামাঞ্চলে বিস্তীর্ণ গাছপালা, ঝোপঝাড় ও সবুজ পরিবেশ থাকলেও দ্রুত নগরায়ণ, বনভূমি উজাড় এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে এসব এলাকা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে দোয়েল।

খাদ্য সংকটও এ পাখির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোয়েল মূলত বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এসব রাসায়নিকের প্রভাব পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ও প্রজনন ব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

প্রকৃতি প্রেমী তরুণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী শুভ সরকার বলেন, “একসময় আমাদের এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দোয়েল দেখা যেত। এখন আগের মতো আর দেখা যায় না। গাছপালা ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় পাখিগুলো তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে।”

ভওয়াখালী এলাকার পম্পা মুখার্জি বলেন, “পরিবেশ দূষণ, কীটনাশকের ব্যবহার এবং নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে দোয়েলের সংখ্যা দিন দিন কমছে। জাতীয় পাখি সংরক্ষণে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।”

পরিবেশ দূষণও দোয়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক এলাকায় তাদের বসবাস কঠিন হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও দোয়েলের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক সময় বাসা নষ্ট হয়ে যায়, ডিম ও ছানার ক্ষতি হয়, যা দোয়েলের বংশবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে।

নড়াইল জেলা বন বিভাগের বন কর্মী হাসান খান বলেন, “দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি এবং প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের কারণে এ পাখির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। দোয়েলসহ সব বন্যপ্রাণী রক্ষায় বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।”

প্রকৃতিবিদদের মতে, দোয়েল শুধু একটি পাখি নয়; এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে সহায়তা করে এই পাখি। তাই দোয়েলের সংখ্যা কমে যাওয়া কেবল একটি প্রজাতির সংকট নয়, বরং পরিবেশের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পাখি দোয়েলকে রক্ষা করতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় গাছ লাগানো, বন ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পাখিবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে জাতীয় পাখি দোয়েলকে টিকিয়ে রাখতে।

(আরএম/এএস/জুন ২৫, ২০২৬)