ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

বড়াইগ্রামে নৃগোষ্ঠীর সরকারি বরাদ্দ ঘিরে অনিয়ম

গোয়ালঘরে বাস করা মেয়েটির ভাগ্যেও জুটলো না শিক্ষাবৃত্তি

২০২৬ জুন ২৫ ১৮:৪৯:৫৮
গোয়ালঘরে বাস করা মেয়েটির ভাগ্যেও জুটলো না শিক্ষাবৃত্তি

অমর ডি কস্তা, নাটোর : নাটোরের বড়াইগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দরিদ্র পরিবারের মধ্যে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। শিক্ষাবৃত্তির জন্য তৈরি করা চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হয় গোয়ালঘরে পরিবারসহ বাস করা নৃগোষ্ঠীর নবম শ্রেণীর মেয়ে শিক্ষার্থীর। সেখানে তার পরিবর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয় গেজেট বহির্ভূত ও মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের একজনকে। যা স্থানীয় নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এছাড়াও উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয় হতে মাত্র ১ দিনের নোটিশে আবেদন চাওয়া, রাতে চূড়ান্ত তালিকা প্রদান, স্বজনপ্রীতি, ভুয়া পরিচয়ে গেজেট বহির্ভূত দাস ও দলিত সম্প্রদায়কে সুবিধাভোগীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, বরাদ্দের সাইকেল ও সেলাই মেশিনের দাম অতিরিক্ত দেখিয়ে আত্মসাৎ সহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সরকারি বরাদ্দের এ অনিয়মের প্রতিবাদে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বড়াইগ্রাম উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ সরকারি বরাদ্দ বিতরণকালে উপস্থিত হননি।

জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বিশেষ এলাকা উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্রগ্রাম ব্যতীত) শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় বড়াইগ্রাম উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর গরীব, দুস্থ, দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ১টি বসত ঘর, ৫টি বাইসাইকেল, ৩টি সেলাই মেশিন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬ জন, মাধ্যমিকের ৯ জন ও উচ্চ মাধ্যমিকের ৬ জন শিক্ষাথীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হবে মর্মে নোটিশ জারি করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস। নোটিশটি ২৪ মে তারিখে স্বাক্ষরিত হলেও ইউএনও বড়াইগ্রাম ফেসবুক পেইজে তা পোস্ট করেন ৪ জুন বৃহস্পতিবার এবং নোটিশে আবেদন জমা দেওয়ার তারিখ দেওয়া আছে ৫ জুন শুক্রবার।

এই পোস্ট দেখে সোহেল রানা কমেন্টেস্ বক্সে লিখেছেন, "তৈরি করা হয়েছে ২৪ মে, পোস্ট করা হয়েছে ৪ জুন আর আবেদনের শেষ তারিখ ৫ জুন। এত অল্প সময়ে হয়তো অনেকেই জানতে বা আবেদন করতে পারবে না। এই বিষয়ে আরও সদয় হওয়া উচিত।"

অপরদিকে গত শুক্রবার রাত ৯টায় ইউএনও কার্যালয়ে নৃগোষ্ঠী ও আদিবাসী সংগঠনের জনৈক দুই নেতাকে ডেকে নিয়ে বরাদ্দের জন্য মনোনীত চূড়ান্ত তালিকা দেয় এবং বলা হয় সকাল ৯টায় (পরেরদিন শনিবার) এমপি সাহেব বরাদ্দ বিতরণ করবেন, তালিকার সবাই যেনো ৮টার দিকে উপস্থিত হয় তা নিশ্চিত করবেন। তালিকা হাতে পেয়ে নেতৃবৃন্দ দেখেন সেখানে ৪ জনের নাম যা সরকারি গেজেট বহির্ভূত দাস ও দলিত সম্প্রদায়ের।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বড়াইগ্রাম উপজেলা সভাপতি লাজারুস মালপাহাড়ি জানান, যাদু কুমার দাস একজন নমশূদ্র দলিত সম্প্রদায়ের। তাদের গেজেট আলাদা। অথচ সে নিজেকে আদিবাসী দাবি করে এবং কৌশলে আদিবাসী নেতা সেজে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজের নামে, তার মায়ের ও আত্মীয় স্বজনের নামে সরকারি ঘর, পানির মটর, সিএনজি অটোরিকশা, বিভিন্ন প্রকল্প, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী সহ নানা ধরনের সুবিধা নিয়েছেন। তার সন্তানেরা প্রতিবারই শিক্ষাবৃত্তি, বাইসাইকেল সহ সকল সুবিধা নিয়েছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী এবারের তালিকায় তার নাম থাকার কথা নয়। অথচ তার নাম সহ তার ৪ জন আত্মীয়ের নাম রয়েছে। গেজেট বহির্ভূত নাম থাকায় এবং এর প্রতিবাদে আমরা সরকারি বরাদ্দ বিতরণ অনুষ্ঠানে যাই নাই। এছাড়া যাচাই বাছাই করে তৈরি করা চূড়ান্ত তালিকায় অতিদরিদ্র নবম শ্রেণির ছাত্রী রাধিকার নাম থাকলেও বরাদ্দের ৫ হাজার টাকা তাকে দেওয়া হয়নি। সেখানে তার নাম কেটে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষক স্বপন কর্মকারের ভাতিজা ও জুয়েলার্স দোকানের কারিগর দীনেশ কর্মকারের ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী নিলয় কর্মকারকে দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাধিকার মা বুলবুলি রানী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ভেবেছিলাম এই টাকা দিয়ে মেয়েকে নবম শ্রেণির একটি গাইড বই সহ আরও কিছু বই-খাতা কিনে দিবো। এমনিতে টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়াতে পারি না। বাবাও তেমন কিছু করে না। আমি মানুষের বাড়িতে আধাবেলা কাজ করে কোন মতে সংসার চালাই। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত সেলাই মেশিনের দাম দেখানো হয়েছে ১১,৭৬৫ টাকা ও বাইসাইকেলের দামও একই অর্থাৎ ১১,৭৬৫ টাকা। অথচ বাজার যাচাই করে দেখা গেছে বিতরণকৃত এই দুই পণ্যের দাম কোনটাই ৮ হাজার টাকার উর্ধ্বে নয়।

স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নেতা সুনীল সরকার বলেন, নৃগোষ্ঠীর বরাদ্দ ও বিতরণ নিয়ে সরকারি দপ্তরের অস্বচ্ছতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি প্রত্যাশা করি না। আশা করি ইউএনও স্যার এ ব্যাপারে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বড়াইগ্রাম উপজেলা সহ-সভাপতি নিমাই পাহাড়ি বলেন, প্রকৃত আদিবাসী ও নৃগোষ্ঠীকে মূল্যায়ন না করে গেজেট বহির্ভূত ভুয়া আদিবাসী নেতা-নেত্রীর কথামতো তালিকার নাম পরিবর্তন করাতে আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমাদের মধ্যে এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী ইউএনও অফিসের স্টাফ সাইফুল ইসলাম, কথিত আদিবাসী নেতা দলিত সম্প্রদায়ের যাদু কুমার দাস ও সরস্বতী দাস। আমরা তাদের অপকর্মের বিচার ও শাস্তি দাবি করছি।

ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, কোন একটি ভুল বুঝাবুঝিতে যদি রাধিকা নামের মেয়েটি শিক্ষা সহায়তা না পেয়ে থাকে তবে উপজেলা প্রশাসন থেকে তার জন্য সহায়তা করা হবে।

(এডিকে/এসপি/জুন ২৫, ২০২৬)