ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

অ্যালার্জি প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই

২০২৬ জুলাই ০৮ ১৮:০২:২২
অ্যালার্জি প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ


৮ জুলাই ২০২৬ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব অ্যালার্জি দিবস। এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো অ্যালার্জি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জিতে ভুগছেন। শিশু, নারী ও পুরুষ—সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এ রোগ দেখা যায়। তাই অ্যালার্জি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

অ্যালার্জি কী?

অ্যালার্জি হলো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার এমন একটি অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া, যেখানে সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন কোনো বস্তু—যেমন ধুলাবালি, ফুলের রেণু, খাবার, ওষুধ বা প্রাণীর লোম—শরীর ভুলবশত ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

অ্যালার্জির প্রধান কারণ

অ্যালার্জির কারণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ কারণগুলো হলো—

* ঘরের ধুলাবালি ও ডাস্ট মাইট

* ফুলের রেণু (পোলেন)

* ছত্রাক (ফাঙ্গাস)

* পোষা প্রাণীর লোম বা খুশকি

* চিংড়ি, কাঁকড়া, ডিম, দুধ, চিনাবাদাম, সয়াবিনসহ কিছু খাবার

* কিছু ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক

* মৌমাছি বা অন্যান্য পোকামাকড়ের কামড়

* ধোঁয়া, সুগন্ধি, রাসায়নিক পদার্থ ও বায়ুদূষণ

* পারিবারিক বা বংশগত প্রবণতা

অ্যালার্জির লক্ষণ

অ্যালার্জির ধরন অনুযায়ী লক্ষণও ভিন্ন হতে পারে।

শ্বাসতন্ত্রে: * বারবার হাঁচি * নাক দিয়ে পানি পড়া * নাক বন্ধ থাকা * কাশি * শ্বাসকষ্ট

ত্বকে: চুলকানি * লালচে ফুসকুড়ি * চাকা ওঠা * একজিমা

চোখে: * চোখ লাল হওয়া * পানি পড়া * চুলকানি * জ্বালাপোড়া

খাদ্যজনিত অ্যালার্জিতে: * ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া * বমি * পেটব্যথা * ডায়রিয়া

গুরুতর লক্ষণ

* শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট * রক্তচাপ কমে যাওয়া * মাথা ঘোরা * অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।এ ধরনের গুরুতর অবস্থা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন।

অ্যালার্জির প্রকারভেদ

১. শ্বাসজনিত অ্যালার্জি: ধুলাবালি, ফুলের রেণু বা দূষিত বাতাসের কারণে নাক ও ফুসফুসে অ্যালার্জি।

২. খাদ্যজনিত অ্যালার্জি: নির্দিষ্ট খাবার গ্রহণের পর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

৩. ত্বকের অ্যালার্জি: প্রসাধনী, সাবান, ধাতু, রাসায়নিক বা কাপড়ের কারণে ত্বকে অ্যালার্জি হয়।

৪. ওষুধজনিত অ্যালার্জি: কিছু ওষুধ গ্রহণের পর শরীরে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

৫. পোকামাকড়জনিত অ্যালার্জি: মৌমাছি, বোলতা বা অন্য পোকামাকড়ের কামড়ে অ্যালার্জি হতে পারে।

নারী, পুরুষ ও শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি

নারীদের ক্ষেত্রে

* প্রসাধনী ও সুগন্ধি ব্যবহারে ত্বকের অ্যালার্জি বেশি দেখা যায়।
* গৃহস্থালির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার রাসায়নিক থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে।
* গর্ভাবস্থায় কারও কারও অ্যালার্জির উপসর্গ পরিবর্তিত হতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে

* কর্মস্থলের ধুলাবালি, ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার কারণে শ্বাসজনিত অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়ে।

* শিল্পকারখানা, নির্মাণ ও কৃষিখাতে কর্মরতদের মধ্যে পেশাগত অ্যালার্জি বেশি দেখা যায়।

শিশুদের ক্ষেত্রে

* দুধ, ডিম, চিনাবাদামসহ কিছু খাবারে অ্যালার্জি বেশি হয়।
* একজিমা ও হাঁপানির সঙ্গে অ্যালার্জির সম্পর্ক রয়েছে।
* অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু খাদ্য অ্যালার্জি কমে যেতে পারে।

অ্যালার্জির জটিলতা

চিকিৎসা না করলে অ্যালার্জি থেকে নানা জটিলতা হতে পারে।

* দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস
* হাঁপানি বেড়ে যাওয়া
* ত্বকে সংক্রমণ
* ঘুমের সমস্যা
* কর্মক্ষমতা ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত
* গুরুতর ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া

পরিসংখ্যান

* বিশ্বের প্রায় ২০–৩০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভোগেন।

* শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি ও হাঁপানির হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

* নগরায়ণ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যালার্জির প্রকোপ বাড়ছে।

* বাংলাদেশেও ধুলাবালি, দূষণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অ্যালার্জি রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হোমিওপ্যাথিতে অ্যালার্জির ব্যবস্থাপনা

হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হলো—"রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা"। এই নীতির আলোকে অ্যালার্জির ক্ষেত্রে শুধু হাঁচি, চুলকানি বা ত্বকের র‍্যাশ নয়; বরং রোগীর শারীরিক গঠন, অ্যালার্জির কারণ, উপসর্গের ধরন, তৃষ্ণা, ঘাম, মানসিক অবস্থা, ঋতুভেদে উপসর্গের পরিবর্তন, পারিবারিক ইতিহাস এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে একজন নিবন্ধিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচন করে থাকেন।

অ্যালার্জি হলো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া। ধুলাবালি, ফুলের রেণু, খাবার, ওষুধ, পোষা প্রাণীর লোম, ছত্রাক কিংবা অন্যান্য অ্যালার্জেনের সংস্পর্শে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে অ্যালার্জির কারণ শনাক্ত করা, তা এড়িয়ে চলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রোগীর লক্ষণ ও সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক প্রয়োজনে বিভিন্ন ওষুধের মধ্যে থেকে নির্বাচন করতে পারেন:-অ্যালিয়াম সেপা, সাবাডিলা,আর্সেনিকাম অ্যালবাম, নেট্রাম মিউরিয়াটিকাম, হিস্টামিনাম,এপিস মেলিফিকা,আর্টিকা ইউরেন্স, রাস টক্স, সালফার, গ্রাফাইটিস, সোরিনাম,ডালকামারা,নাক্স ভোমিকা, পালসেটিলা, লাইকোপোডিয়াম, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, সিলিসিয়া, বেলাডোনা ইউফ্রেশিয়া, কালি বাইক্রোমিকাম, কালি সালফিউরিকাম, মার্কিউরিয়াস সলিউবিলিস,হেপার সালফিউরিস,টিউবারকুলিনাম, ব্যাসিলিনাম, আরুন্ডো মৌরিটানিকা, ওয়াইথিয়া হেলেনয়েডস, অ্যারালিয়া রেসেমোসা, আইপিকাকুয়ানহা, অ্যান্টিমোনিয়াম টারটারিকাম,ফসফরাস, স্পঞ্জিয়া টোস্টা, নেট্রাম সালফিউরিকাম,ফেরাম ফসফরিকাম, থুজা অক্সিডেন্টালিস সহ আরো অনেক ঔষধ রোগীর লক্ষণের উপর আসতে পারে।

সতর্কতা

* উপরোক্ত কোনো ওষুধই শুধুমাত্র রোগের নামের ভিত্তিতে নিজে নিজে সেবন করা উচিত নয়। রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এবং সামগ্রিক উপসর্গ বিবেচনা করে একজন দক্ষ চিকিৎসক ওষুধ নির্বাচন করেন।

* হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণের আগে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

* অ্যালার্জির প্রকৃত কারণ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান এবং নির্ধারিত চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করুন।

* এছাড়াও, অনেক তথাকথিত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রোগীকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের পাশাপাশি বিভিন্ন মলম, ক্রিম বা অন্যান্য বাহ্যিক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে থাকেন। হোমিওপ্যাথির প্রবর্তক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান তাঁর গ্রন্থসমূহে এ ধরনের মিশ্র বা ভিন্নধর্মী চিকিৎসাপদ্ধতির সমালোচনা করেছেন এবং একে "শঙ্করজাতের (মিশ্র) হোমিওপ্যাথি" হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই রোগীদের উচিত চিকিৎসকের যোগ্যতা, চিকিৎসাপদ্ধতি এবং নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করা।

ঘরোয়া করণীয়

* ঘর সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।
* বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও পর্দা নিয়মিত ধুয়ে নিন।
* ধুলাবালি পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন।
* যেসব খাবারে অ্যালার্জি হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলুন।
* ধূমপান ও ধোঁয়া থেকে দূরে থাকুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
* ঘরে ছত্রাক বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ হতে দেবেন না।
* প্রয়োজনে অ্যালার্জি পরীক্ষা করে কারণ শনাক্ত করুন।

পরিশেষে বলা যায়, ৮ জুলাই বিশ্ব অ্যালার্জি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অ্যালার্জি অবহেলা করার মতো সমস্যা নয়। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, অ্যালার্জির কারণ এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে অ্যালার্জি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সচেতনতাই পারে অ্যালার্জিজনিত জটিলতা কমিয়ে সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।