ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

একজন জমির উদ্দিন সরকার

২০২৬ জুলাই ১৩ ১৮:২৩:০২
একজন জমির উদ্দিন সরকার

আবদুল হামিদ মাহবুব


গতকাল (১২ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশের রাজনীতি হারাল তার এক নীরব প্রজ্ঞার প্রতীককে। সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ভাষা আন্দোলনের সৈনিক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর বিদায়ে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়, দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

কিছু মানুষের পরিচয় তাঁদের পদে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কিছু মানুষ তাঁদের পদকে মর্যাদা দেন নিজেদের ব্যক্তিত্ব, সততা ও প্রজ্ঞা দিয়ে। জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বগুলোর একাধিকটিতে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, কিন্তু কখনো পদকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার সোপান বানাননি। বরং দায়িত্বকে তিনি দেখেছেন জনকল্যাণের অঙ্গীকার হিসেবে। এই কারণেই তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে, বিতর্কের উত্তাপে নয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একজন সৈনিক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই আন্দোলনের চেতনা তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্র, সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নে তিনি বরাবরই ছিলেন স্পষ্ট অবস্থানের মানুষ। বাংলাদেশের রাজনীতির নানা সংকট, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং রাজনৈতিক সংঘাতের দীর্ঘ পথ তিনি অতিক্রম করেছেন দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সঙ্গে।

রাষ্ট্র পরিচালনার নানা স্তরে তাঁর বিচরণ ছিল সমান দক্ষতায়। জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি সংযম, শালীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেছেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন নির্ভার ও নীরব দক্ষতায়। শিক্ষামন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব—যদি দায়িত্ববোধ অটুট থাকে।

কিন্তু জমির উদ্দিন সরকারকে কেবল তাঁর সরকারি পদগুলোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রে। এমন এক সময়ে, যখন রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থের আলোচনা বেশি, তখন তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, দমন-পীড়ন কিংবা প্রতিকূলতা; কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা মনে করতেন রাজনীতি মানে জনসেবা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে তিনি দলের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর সাক্ষী। বিশেষ করে বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ভোটাধিকারের দাবিতে চলমান সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক অভিজ্ঞ অভিভাবক। বয়স তাঁকে ক্লান্ত করতে পারেনি; রাজনৈতিক বিশ্বাস তাঁকে সচল রেখেছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে, দলীয় সিদ্ধান্তে কিংবা নীরব পরামর্শে তিনি বারবার গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন এবং জনগণের অধিকারের প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছেন।

তাঁর আরেকটি বড় শক্তি ছিল ব্যক্তিগত বিনয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে তিক্ততা প্রায়ই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গ্রাস করে, সেখানে জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন সৌজন্য ও শালীনতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। রাজনৈতিক মতভেদকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ দেননি। সহকর্মী, প্রতিপক্ষ কিংবা নবীন রাজনীতিক; সবাই তাঁর মধ্যে একজন ভদ্র, সংযত ও মননশীল মানুষকে খুঁজে পেয়েছেন। এই মানবিক গুণই তাঁকে দলীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।

তাঁর মৃত্যু আমাদের আবারও একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমেই এমন অভিজ্ঞ, পরিমিতিবোধসম্পন্ন এবং আদর্শনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হারাচ্ছে, যাঁদের উপস্থিতি রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীলতার বার্তা দিত। তাঁদের অভাব শুধু একটি দলের নয়; গণতান্ত্রিক রাজনীতিরও ক্ষতি।

জমির উদ্দিন সরকারের জীবন আমাদের শেখায়, রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পথটি কীভাবে অতিক্রম করা হয়েছে। তিনি ক্ষমতা পেয়েছেন, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার প্রতিকূলতার বোঝাও বহন করেছেন। কিন্তু তাঁর সততা, সংযম, প্রজ্ঞা এবং আদর্শের প্রতি আনুগত্য নিয়ে খুব কম প্রশ্নই উঠেছে। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।

তাঁর বিদায়ে শোকাহত পরিবার, সহকর্মী, রাজনৈতিক অনুসারী এবং শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে স্মরণ করছেন, তখন তাঁর কর্মময় জীবনও আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়; আমরা কি আদর্শনিষ্ঠ, শালীন এবং দায়িত্বশীল রাজনীতির সেই ধারাকে ধরে রাখতে পারব, যার একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার?

মানুষ চলে যান, কিন্তু কিছু জীবন সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তেমনই একজন মানুষ। তাঁর প্রস্থান একটি জীবনের সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর সততা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।