প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
প্রতি মাসে শুধু ভাড়া বাবদ গচ্চা যাচ্ছে কোটি টাকা
নড়াইলে নিজস্ব ভবন নেই ২৭ দপ্তরের, ভাড়া বাসায় চলছে কার্যক্রম
২০২৬ জুলাই ১৪ ১৭:৪১:২৪
রূপক মুখার্জি, নড়াইল : নড়াইলে নিজস্ব ভবন না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া বাসায় কার্যক্রম চলছে জেলার ২৭টি সরকারি দপ্তরের। এতে প্রতিবছর বিপুল অংকের টাকা ভাড়া গুণতে হচ্ছে এসব দপ্তরকে। একই সঙ্গে বারবার কার্যালয় স্থানান্তর ও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সেবা প্রত্যাশীদের।
এ পরিস্থিতিতে জেলার বিভিন্ন ভাড়া বাসায় থাকা সরকারি দপ্তরকে একই স্থানে আনতে সমন্বিত কার্যালয় ভবন নির্মাণের দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা প্রত্যাশীদের।
জেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নড়াইলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে এসব কার্যালয়।
যথাযথঅবকাঠামো গড়ে না ওঠায় সেবার মান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও প্রলম্বিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নড়াইল গণপূর্ত বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় ৮০টি সরকারি দপ্তর রয়েছে। এর মধ্যে ভাড়া বাসায় পরিচালিত হচ্ছে ২৭টি সরকারি দপ্তর। ২০১৮ সালের হিসেবে এসব কার্যালয়ের ভাড়ার জন্য বর্তমান বাজারদরে এই খরচ কোটির ঘরে পৌঁছেছে।
ভাড়া বাসায় পরিচালিত সরকারি দপ্তরগুলো হলো, নড়াইল মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, জেলা তথ্য অফিস, কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়, জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা মৎস্য অফিস, জেলা পাট উন্নয়ন কার্যালয়, জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়, কর কমিশনারের কার্যালয়, জেলা সঞ্চয় অফিস, শহর সমাজসেবা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জেলা কার্যালয়, প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম কার্যালয়, জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয়, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জেলা কার্যালয়, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়, জেলা সমবায় অফিস, জেলা পল্লী উন্নয়ন (বিআরডিবি) অফিস, জেলা বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, জেলা পরিসংখ্যান অফিস এবং জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়।
এসব দপ্তরের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জেলা কার্যালয়। প্রতিমাসে এ দপ্তরকে ভাড়া দিতে হচ্ছে ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। এ হিসাবে দপ্তরটির বছরে ভাড়া গুণতে হচ্ছে চার লাখ ১৪ হাজার টাকা।
বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, জেলায় অনেক সরকারি দপ্তর ভাড়া বাসায় কার্যালয় পরিচালনা করে আসছে। বিসিক এর মধ্যে একটি। ভাড়া বাসায় কাজ করতে আমাদের অনেক সমস্যা হয়। সরকারিভাবে জেলায় একটি সমন্বিত অফিস ভবন থাকলে একই স্থানে সব কর্মকর্তা কার্যালয় পরিচালনা করতে পারেন। পাশাপাশি সেবাগ্রহীতারাও সুফল পাবেন।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘প্রতিবছর সরকারের একটি মোটা টাকা বাসা ভাড়াবাবদ খরচ হচ্ছে। সমন্বিত অফিস ভবন হলে সরকারি অনেক কম টাকা খরচ হবে। জেলা প্রশাসন এ রকম একটি উদ্যোগ নিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা হবে। পাশাপাশি গণপূর্ত বিভাগের কাছে অনুরোধ, তারা যেন অতিদ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন এবং এ ধরনের সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান’।
জেলার অধিকাংশ ভাড়ায় পরিচালিত কার্যালয় গুলো শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে। একাধিকবার দপ্তরে কোনো সেবাগ্রহীতার কাজ থাকলে তাকে দিনের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। এতে সময় ও যাতায়াত দুটোই বাড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও গ্রামাঞ্চল থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হন।
নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের তারাপুর গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল বিশ্বাস বলেন, ‘সরকারি জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক দপ্তর ভাড়া বাসায় থাকায় বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে সরকারকে। সেই সঙ্গে কোনো কার্যালয় বাসা পরিবর্তন করলে অনেক সময় ওই কার্যালয় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের দাবি, জেলায় বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাসা ভাড়ায় থাকা অফিসগুলো একটি ভবনে আনার দাবি জানাই। জেলায় একটি সমন্বিত অফিস হলে ভাড়া সাশ্রয়ের পাশাপাশি জনগণের সময় ও ভোগান্তি কমবে।’
এদিকে, জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরও দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবের কারণে অনেক সময় সরকারি কার্যক্রম প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, ‘ভাড়া অফিসে সরকারি কর্মসূচি সরকার যেভাবে চায় সেভাবে করা সম্ভব হয় না। ভাড়া ভবনে সরকারের ভাড়াও যাচ্ছে অনেক বেশি।
তিনি বলেন, নড়াইল ছোট জেলা। এখানে সরকারি অফিস নেওয়ার মতো সেই মানের তেমন ভবন নাই। আর বার বার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলে প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেতে সেবাগ্রহীতাদের সমস্যা হয়।’
একই ধরনের সমস্যার কথা বলছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান। জেলা পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় হওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় নানা অসুবিধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিমাসে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হয়। জেলা অফিসের জন্য আমাদের যে জয়গা দরকার, তা এই ঘরে নেই। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।’
তবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সরকারি দপ্তরগুলোকে একটি সমন্বিত ভবনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে নড়াইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারোয়ার হোসাইন বলেন, ‘জেলায় অনেক সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কাজ ভাড়া বসায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে সরকারের প্রতিবছর কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে সব অফিসকে এক ভবনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি দ্রুত সমাধান হবে।’
(আরএম/এসপি/জুলাই ১৪, ২০২৬)
