ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

যুগের শ্রেষ্ঠ প্রয়াত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার

২০২৬ জুলাই ১৪ ১৮:৪৩:২৫
যুগের শ্রেষ্ঠ প্রয়াত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার

রহিম আব্দুর রহিম


ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের অজগাঁ নয়াপাড়া গ্রামে ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। মারা যান, ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ভোর ৪টায়। তাঁর বাবার নাম মৌলভী মুহাম্মদ আজিজ বক্স এবং মা ছিলেন বেগম ফখরুনন্নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুনাম কুড়ান।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তির রাজনীতি জীবন শুরু হয় ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে। এরপর তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হবার গৌরব অর্জন করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘জাগদল’ গঠন করলে তাতে যোগ দেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হন এবং শুরু থেকেই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও জমির উদ্দিন সরকার দুই দফা জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। তিনি দুইবার বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

জনাব ব্যারিস্টার মোট পাঁচবার '১৯৭৯,' '১৯৯১,' '১৯৯৬,' '২০০১' ও '২০০৯ সালে' জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পঞ্চগড়-১, ঢাকা-৯, বগুড়া-৬ ও দিনাজপুর-১ আসন থেকে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছেন। বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের এক কন্যা,নিলুফার জমির ও দুই পুত্র নওশাদ জমির ও নওফল জমির। তাঁর স্ত্রী নূর আখতার আরও আগেই মারা গেছেন। ছেলে দুইজনই ব্যারিস্টার, বড় ছেলে নওশাদ জমির পঞ্চগড় -১, আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
জীবনদশায় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন সাধারণ মানুষের আপনজন। পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে সর্বমহলে তাঁর পরিচিতি ছিলো। যাঁর রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিলো বিনয় ও জনহিতকর কার্যকলাপ। যিনি রাজনৈতিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে পঞ্চগড়ে দল মত নির্বিশেষে সবার মনে স্থান করে নিয়েছিলেন।

পঞ্চগড় মানুষের কাছে তাঁর পরিচিত ছিলো 'ব্যারিস্টার সাহেব'। জেলায় অনেক ব্যারিস্টার ছিলেন ও আছেন। কিন্তু জেলার মানুষ ব্যারিস্টার বলতে জমির উদ্দিনকেই বোঝেন। কারণ, তিনি পঞ্চগড়ের মানুষের খুবই কাছে যেতে পেরেছিলেন। তিনি মানুষের বিপদে আপদে ছিলেন ভরসার প্রতীক।জেলার সকল শ্রেণি পেশার জন মানুষ যেকোন অবস্থায় তাঁর সাথে অবাধ এবং নির্ভয়ে দেখা করতেন পারতেন। সবার কথাই মনোযোগ সহকারে শুনতেন। তিনি তাঁর কর্ম এবং রাজনৈতিক জীবনে পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এলাকার বেকারদের সাধ্যমতো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর সংবাদ শুনে জেলার নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। পঞ্চগড় সদর উপজেলার সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একদিনের সংরক্ষিত ছুটি ঘোষণা করে মরহুমের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। যে যুগে প্রতিহিংসা প্রতিশোধের রাজনীতিতে সমাজ রাষ্ট্র কুলষিত; ঠিক ওই সময় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন সহনশীল এবং উদার গণতান্ত্রিকমনা যুগের শ্রেষ্ঠ এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

লেখক: নাট্যকার ও গবেষক।