প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
বর্ষার পরীক্ষা, শিক্ষার্থীর ক্ষোভ ও রাষ্ট্রের করণীয়
২০২৬ জুলাই ১৪ ১৯:১৩:৩৯
মীর আব্দুল আলীম
আজ ১৪ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- রাষ্ট্র কি শিক্ষার্থীদের কথা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনছে, নাকি সংলাপের আগেই পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও উঠে এসেছে- ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন কি এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে?
রাষ্ট্র, শিক্ষার্থী ও জনগণ এই তিন পক্ষ কখনোই পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। রাষ্ট্রের শক্তি জনগণের ওপর কর্তৃত্বে নয়, জনগণের আস্থায়। আর সেই আস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে সংলাপ, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের ওপর। যখন এই আস্থায় ফাটল ধরে, তখন রাজপথে ক্ষোভের জন্ম হয়; আবার যখন আন্দোলনের কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েন, তখন একটি ন্যায্য দাবিও বিতর্কের মুখে পড়ে। তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মুখোমুখি অবস্থান নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা।
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যা, ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত। অনেক শিক্ষার্থী কোমরসমান পানি পেরিয়ে, নৌকায় কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি সহ্য করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছে। এমন বাস্তবতায় পরীক্ষা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবিকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যায় না। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় আগেভাগেই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে হয়তো আজকের এই অচলাবস্থা তৈরি হতো না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো অঞ্চলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অথচ দুর্যোগকালীন পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি স্থায়ী জাতীয় নীতিমালা এখনও গড়ে ওঠেনি। কোন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত হবে, কীভাবে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ হবে, কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে প্রতিবছর একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের জন্ম নিত না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখনই উচিত এ বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষা নেওয়া নয়; প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। দুর্যোগের সময় সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তখনই গড়ে ওঠে, যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মানবিকতা, বাস্তবতা এবং দূরদর্শিতার প্রতিফলন দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন সেটি শুধু প্রতিবাদের ভাষা নয়; অনেক সময় তা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ারও একটি ইঙ্গিত। তাই পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা উচিত। সংলাপের বিকল্প সংঘাত নয়। বরং সংলাপই ভুল বোঝাবুঝি দূর করে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে, জনদুর্ভোগ কোনো আন্দোলনের সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। আন্দোলনের নৈতিক শক্তি তার যুক্তিতে, শৃঙ্খলায় এবং জনসমর্থনে। মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে নয়, মানুষের হৃদয় জয় করেই একটি ন্যায্য আন্দোলন সফলতা অর্জন করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরমুখী সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক কিংবা জরুরি সেবার পথ দীর্ঘ সময় অবরোধ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এসব স্থানে সামান্য বিলম্বও বহু মানুষের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিদেশগামী যাত্রী, অসুস্থ রোগী, পরীক্ষার্থী কিংবা জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ কারওই এ দুর্ভোগ প্রাপ্য নয়।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন আমাদের প্রবাসীরা। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারলে তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট মিস করেন, নতুন টিকিট কিনতে বাধ্য হন, বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। অনেকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি পর্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। একটি ন্যায্য আন্দোলনের কারণে এমন ক্ষতি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিও একই আহ্বান থাকবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণে সর্বোচ্চ ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতার পরিচয় দিতে হবে। শক্তি প্রয়োগ নয়, আস্থা সৃষ্টি এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদেরও শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হবে। কারণ সংঘর্ষে কেউ প্রকৃত অর্থে জয়ী হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সরকারের উচিত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। যা আগেই হয়তো করা উচিৎ ছিল। যেগুলো যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া এবং যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়, সেগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরা। নীরবতা বা অনমনীয় অবস্থান কখনোই সংকটের সমাধান আনে না; বরং তা অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে।
এই সংকটকে কেবল একটি আন্দোলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং রাষ্ট্র-শিক্ষার্থী সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়নের একটি সুযোগ। যদি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি কার্যকর দুর্যোগকালীন শিক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়; তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি সাধারণ মানুষের অধিকার ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতিও শিক্ষার্থীদের সমান দায়িত্ব রয়েছে। দাবি আদায়ের সংগ্রাম তখনই ইতিহাসে সম্মান পায়, যখন তা নৈতিকতা, সংযম ও মানবিকতার সীমারেখা অতিক্রম করে না।
আজ জয়-পরাজয়ের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন সমাধানের রাজনীতি। প্রয়োজন সহমর্মিতার রাজনীতি। বর্ষা ও দুর্যোগের বাস্তবতা বিবেচনায় পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আরও আন্তরিকভাবে বিবেচনা করা যেত। একই সঙ্গে আন্দোলনের কর্মসূচিও এমন হওয়া উচিত, যাতে দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল না হয়।
একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা যেমন জনগণের আস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তেমনি একটি আন্দোলনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় তার নৈতিক শক্তিতে। সরকার যদি সংলাপের হাত বাড়ায় এবং শিক্ষার্থীরা যদি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, তাহলে এই সংকটও সমাধানের পথ খুঁজে পাবে। আমরা চাই আস্থার ভিত্তিই হেক সংলাপ, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার। তাহলেই শিক্ষা বাঁচবে, জনস্বার্থ রক্ষা পাবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট।
