ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

রাস্তার পাশের মানুষটি

২০২৬ জুলাই ১৫ ১৭:৩৫:৪৮
রাস্তার পাশের মানুষটি

আবদুল হামিদ মাহবুব


এই মানুষটির আগে কি ধর্ম ছিল, পরে কি ধর্ম নিয়েছে, সেই প্রসঙ্গে আমি কিছুই বলতে চাই না। আমি তাকে একজন মানুষ হিসাবে দেখছি। যারা উদ্যোগী হয়ে তাকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার, এবং সারিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন; তাদেরকে সাধুবাদ জানিয়েই লেখা লিখছি।

বুড়ো চন্ডীদাসের বাণী; 'সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই'। আমার কাছেও মানুষই প্রধান। সে যে ধর্মেরই হোক, যে গোত্রেরই হোক। ভূপেন হাজারিকা গেছিলেন; 'মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু....

রাস্তাটির পাশ দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ হেঁটে যেতেন। কেউ অফিসে। কেউ আদালতে। কেউ স্কুল-কলেজে। সবার চোখেই পড়তেন এক নারী। এলোমেলো চুল। ক্লান্ত দৃষ্টি। অনিশ্চিত জীবন। কিন্তু খুব কম মানুষই জানতেন, তারও একটি নাম আছে। তারও একটি অতীত আছে। তিনি খাদিজা নাজমিন।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশের স্প্রিং কর্নার নামের দৃষ্টিনন্দন স্থানই ছিল তার দীর্ঘদিনের ঠিকানা। খোলা আকাশের নিচেই কেটে গেছে অসংখ্য দিন আর রাত। মানসিক অসুস্থতার কারণে কখনো তিনি চিৎকার করতেন, কখনো অসংলগ্ন কথা বলতেন। অনেকেই বিরক্ত হতেন। কেউ ভয় পেতেন। কিন্তু সেই আচরণের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভেঙে পড়া মানুষের নীরব আর্তনাদ।

অবশেষে তার জীবনে এলো একটুখানি আশার আলো। জেলা প্রশাসক মৌলভীবাজারের উদ্যোগে, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং শেখ বোরহান উদ্দিন (রহ.) ইসলামী সোসাইটি (বিআইএস) মৌলভীবাজারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় গত সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) খাদিজা নাজমিনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মানসিক পরিচর্যার জন্য ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এটি শুধু একটি উদ্ধার অভিযান নয়। এটি একজন মানুষকে আবার মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দেওয়ার গল্প।

উদ্ভ্রান্ত আমাদের সমাজ যাকে পাগলিনী বলছিল সেই খাদিজা নাজমিনের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের লংগুরপাড় এলাকায়। একসময় তারও ছিল সংসার। ছিল স্বপ্ন। পরে নানা কারণে সেই সংসার ভেঙে যায়। ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। একসময় হারিয়ে ফেলেন স্বাভাবিক জীবনের পথ। শুরু হয় আশ্রয়হীন এক দীর্ঘ জীবন। তার একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। কিন্তু আজ সেই সন্তানের অবস্থানও নিশ্চিতভাবে কেউ জানেন না। একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে!

উদ্ধারের পর তিনজন পুলিশ সদস্যের নিরাপত্তায় শেখ বোরহান উদ্দিন (রহ.) ইসলামী সোসাইটি (বিআইএস) মৌলভীবাজারের নারী বিভাগের সদস্য ও ইউপি সদস্য রিতা দেব তাকে ঢাকার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেন। সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন, সময়মতো চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং আন্তরিক যত্ন পেলে অনেক মানসিক অসুস্থ মানুষই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এই খাদিজা নাজমিনও সুস্থ হয়ে উঠবেন। উদ্ধারকারীদের মনোবাসনা সেটাই। তাই বোরহানউদ্দিন সোসাইটি মনে করে শুধু উদ্ধার নয়, তাদের পাশে দীর্ঘমেয়াদে দাঁড়ানোও জরুরি।

খাদিজা নাজমিনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য; কোনো মানুষ জন্ম থেকে পথের মানুষ হয়ে যায় না। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, অবহেলা আর বিচ্ছিন্নতাই অনেককে রাস্তায় এনে দাঁড় করায়। খাদিজা নাজমিন যে আশ্রয় কেন্দ্রে গেল, কিংবা যেখানে তাকে পৌঁছে দেয়া হলো; হয়তো এই আশ্রয়কেন্দ্র থেকেই শুরু হবে তার নতুন জীবন। হয়তো একদিন তিনি ফিরে পাবেন হারিয়ে যাওয়া হাসি। আর এটাই হবে মানবতার সবচেয়ে সুন্দর জয়। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আরো অনেক ভবঘুরে আছেন। তাদেরও কোনো গতি হোক আমি সেই প্রত্যাশা রেখে লেখাটি শেষ করছি। আর আরেকটা কথা। আমি জানি এই লেখার সাথে ওনার ছবিটা দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। তারপরও দিলাম। যদি তার ছেলেটি, অথবা কোন স্বজন উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তাহলে হয়তো তিনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন সেই আশায়, এই ছবি দেওয়া।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।