প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
রথযাত্রা: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাঙালির অদম্য আধ্যাত্মিক যাত্রা
২০২৬ জুলাই ১৫ ১৮:৩৩:৩৯
মানিক লাল ঘোষ
রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সনাতন সংস্কৃতির এক গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক পরিক্রমা। প্রতি বছর আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা শুরু হয়। এই উৎসবের মূল দর্শন হলো পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন। রথযাত্রার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের এই উৎসবের মূলে রয়েছে বৃন্দাবন থেকে শ্রীকৃষ্ণের মথুরা যাত্রার স্মৃতি। স্কন্দপুরাণ ও পদ্মপুরাণের মতো প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতে এর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে এবং মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রথযাত্রায় অংশগ্রহণ উৎসবটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
রথযাত্রার মূল আকর্ষণে রথের ওপর সুসজ্জিত বিগ্রহে অধিষ্ঠিত থাকেন স্বয়ং জগতের নাথ শ্রীজগন্নাথ দেব, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীবলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রা দেবী। জগন্নাথ অর্থ জগতের নাথ বা অধিপতি। তাঁর অসম্পূর্ণ বিগ্রহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বর মানুষের সীমাবদ্ধতাকে ধারণ করেন এবং তিনি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বা গোত্রের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। যখন তিনি রথে চড়ে মাসির বাড়ি বা গুন্ডিচা মন্দিরে ভ্রমণে বের হন, তখন জাঁকজমক ত্যাগ করে সাধারণ ভক্তের দোরগোড়ায় নেমে আসেন, যা তাঁর অসীম করুণার পরিচয়।
বাংলাদেশে রথযাত্রা এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ধামরাইয়ের রথযাত্রা ঐতিহ্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কয়েকশো বছরের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ধামরাইয়ের রথ যেমন তার বিশাল আকৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রথযাত্রাও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ঢাকা শহরের ইসকন মন্দির, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রথ এবং দেশের অন্যান্য মন্দিরগুলোতে যে ব্যাপক আয়োজন হয়, তা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক অনন্য প্রতিফলন। রথযাত্রার এই পবিত্র দিনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যখন রথের দড়ি টানার জন্য একত্রিত হয়, তখন তা এক অপূর্ব সামাজিক মেলবন্ধনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। এই দড়ি টানা কেবল একটি আচার নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার চোখে যে সবাই সমান—এই উপলব্ধির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
উপনিষদে মানবদেহকে রথের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে শরীর হলো রথ, বুদ্ধি হলো সারথি এবং মন হলো রশি। রথযাত্রার মূল শিক্ষা হলো, সঠিক বুদ্ধির সারথি দিয়ে যদি জীবন পরিচালনা করা যায়, তবেই ভবসিন্ধু পার হওয়া সম্ভব। রথ যখন অচলপ্রায় জীবনকে টেনে নিয়ে এগিয়ে যায়, তখন আমরাও যেন অন্তরের অন্ধকার ঘুচিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাই। সাত দিন পর উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। উল্টো রথযাত্রায় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবী গুন্ডিচা মন্দির থেকে পুনরায় মূল মন্দিরে (শ্রীমন্দিরে) ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন আমাদের জীবনের চঞ্চলতাকে বিসর্জন দিয়ে পুনরায় শান্তিময় ও সত্যের পথে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
আজকের যান্ত্রিক যুগে রথযাত্রা আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়। ইতিহাসের এই অমোঘ স্রোতে ভেসে আমরা যদি একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি, তবেই সার্থক হবে এই উৎসব। আসুন, এই পবিত্রতায় নিজেদের শুদ্ধ করি এবং অশুভ শক্তিকে জয় করে সত্য ও ন্যায়ের পথে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাই। জয় জগন্নাথ!
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
