ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

৬৯'র স্মৃতি কথায় পঞ্চগড়ের রাজপথ  

২০২৬ জুলাই ১৫ ১৯:০২:১৩
৬৯'র স্মৃতি কথায় পঞ্চগড়ের রাজপথ  

অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান আজু


জানুয়ারি '৬৯ থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। মাঝে মাঝেই ক্লাস বর্জন ধর্মঘটের পাশাপাশি ছাত্র নেতৃত্বে শুরু হলো সমাজের চোর ডাকাত উচ্ছেদ অভিযান। দলে দলে ছাত্ররা গ্রাম থেকে চোর ডাকাত পকেটমার ধরে এনে বেদম মারপিট করে কান ধরে তওবা করিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া শুরু করলো। গ্রামে গঞ্জে ছাত্রদের দাপট তখন চরমে। দারোগা পুলিশ তহশিলদার সহ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা পর্যন্ত ছাত্রদের সমীহ করে চলে। বাসে ট্রাকে যাতায়াতে ছাত্র হলে ভাড়া মওকুফ। মাঝে মাঝেই বাসে চড়ে দলবেঁধে পঞ্চগড় যাই। শেরে বাংলা পার্কে মিটিং হয়, মিছিল হয় আমরা মিছিলে যোগ দেই।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অফিস তখন আজকের পঞ্চগড় সরকারি অডিটোরিয়াম সংলগ্ন জেলা পরিষদের স্টাফ কোয়ার্টারে। সেখানে একদিন কুতুবউদ্দিন নামক এক চোরকে পরবর্তীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও হাফিজাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা ভাই যে মার মেরেছিলেন তা মনে হলে আজো ভয়ে আতঙ্কে আমার গায়ের লোম শিহরে উঠে। ছাত্রদের দাপটে অফিস আদালত সরকারি অফিসে ঘুষ দূর্নীতি বন্ধ হয়ে যায়। চুরি ডাকাতি, সমাজবিরোধী কার্যক্রম, মজুতদারি, কালোবাজারি, চোরাচালান কার্যক্রম তখন সমাজ থেকে উধাও।

খবর পাওয়া গেল ২০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে ছাত্রনেতা আসাদ ও নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর নিহত হয়েছে। সারাদেশ তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবোনা। আইয়ুব খানের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে।এধরণের শ্লোগানে মুখরিত সারাদেশের রাজপথ।২৪ জানুয়ারি সংঘটিত হয় '৬৯ এর মহান গণঅভ্যুত্থান। আইয়ুব খানের তখতে তাউস নড়বড়ে হয়ে উঠে। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনা হেফাজতে হত্যা করা হয়।

১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃশহীদ শামসুজ্জোহা ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর এ মৃত্যু চলমান আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দান করে। এমনই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আমরা মিছিল করলাম জেলের তালা ভেঙ্গেছি শেখ মুজিবকে এনেছি। তোমার আমার ঠিকানা। পদ্মা মেঘনা যমুনা। পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা।

২২ ফেব্রুয়ারী '৬৯ শেখ মুজিব মুক্তি পেলেন। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে,দেশ স্বাধীনের পর যার নামকরণ করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান,দশলক্ষ মানুষের এক বিশাল জনসমুদ্রে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ বাংলার নয়নমণি শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করার প্রস্তাব দিলে দশলক্ষ মানুষ বিশলক্ষ হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তা সমর্থন করেন। তখন থেকে বঙ্গবন্ধু শব্দটি শেখ মুজিবের নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। গ্রামে গঞ্জে আমরাও তখন যেন এক একটি ক্ষুদে মুজিবে পরিনত হয়ে যাই।লাহোরে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আহুত পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দলের গোল টেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ছয়দফা দাবিকে জোরালো ভাবে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ছয়দফার আলোকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনা করতে হবে।গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে আইয়ুবের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পর্দার অন্তরালে ক্ষমতার পালা বদল ঘটে। ফলশ্রুতিতে ২৫ মার্চ ১৯৬৯ সাল আইয়ুব খান পদত্যাগ করলে ক্ষমতার মসনদে আসীন হন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। তিনি সমগ্র পাকিস্তানে পূনরায় সামরিক আইন জারি করে ঘোষণা করেন- দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন। যথাশীঘ্র সম্ভব নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যাবেন।সামরিক আইন জারির ফলে দেশে আপাততঃ শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে এলো। স্কুল কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হলে আমরা পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম।

প্রতিদিন স্কুলে যাই। পথে অন্ততঃ পনের বিশজনের সাথে দেখা হয় কথা হয়। লক্ষ্য করলাম বিগত আন্দোলন সংগ্রাম আমাদের চিন্তার জগতে এক বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার ফলে একদার সোনার বাংলা আজ শস্মান বাংলায় পরিনত হয়েছে। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলে ভরা পূর্ব বাংলার ঘরে ঘরে আজ ক্ষুধা আর দারিদ্র্যতার হাহাকার। শেখ মুজিব এ অবস্থার অবসান ঘটানোর সংকল্প ব্যক্ত করলে বার বছরের অধিককাল তাঁকে অন্ধ কারার বদ্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দী থাকতে হয়েছে। আমাদেরও সকল চিন্তা চেতনায় মনে প্রাণে একটি ভাবনাই জুড়ে বসেছে - যে করেই হোক পশ্চিম পাকিস্তানের শৃঙ্খলমুক্ত করে পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তি ঘটাতে হবে। বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে পাঞ্জাবি শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর ছিনিমিনি খেলা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

লেখক: আইনজীবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।