প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
জুলাইযোদ্ধা এবং ভুয়া যোদ্ধা
২০২৬ জুলাই ১৬ ১৭:২৯:৩৯
চৌধুরী আবদুল হান্নান
গত ৮ জুলাই সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত আওয়ামী আমলে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় সংঘটিত একটি চরম অব্যবস্থাপনার কাহিনী আমাদের স্মরণ করে দিলো। খবরে বলা হয়েছে, জুলাই যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তিন হাজারের বেশি নতুন আবেদন পড়েছিল যার মধ্যে দুই শতাধিক আবেদনকারীর তথ্য পুরোপুরি ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, এই দুই সংস্হার মাঠ পর্যায়ের তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
আওয়ামী সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা সনদ বেঁচাকেনার কলঙ্কজনক ঘটনাগুলো মানুষ ভুলে যায়নি। সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রী মিলেমিশে এবং যোগসাজশে তাদের আত্মীয় স্বজনদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দিয়েছিলেন আর অর্থের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রি করে নির্বিঘ্নে অর্থ লুটে নিয়েছেন।
‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আর সনদ কেলেঙ্কারীর লজ্জাজনক কাহিনী কেবল দেশের ভিতর সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে।
দেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিককে স্মারক হিসেবে একটি করে ক্রেস্ট দেওয়া হয়। প্রতিটি ক্রেস্টে একভরি স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা থাকার কথা ছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে, বিএসটিআই কর্তৃক পরীক্ষা করে দেখা যায় একটি ক্রেস্টে তিন আনা স্বর্ণ এবং রুপার বদলে ৩০ ভরি পিতল, তামা ও দস্তা দেওয়া হয়েছে।
আসলে তখন তো রাষ্ট্রের প্রায় সকল অঙ্গ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দুর্দশা এমনই হয়। অব্যবস্থা, অবিচার , দুর্নীতিতে তারা সকল সীমা অতিক্রম করেছিল।
ফলে তারা এক পর্যায়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের শোচনীয় পতন ঘটে। সে আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তারাই জুলাইযোদ্ধা, সময়ের সাহসী সৈনিক, তারা সরকারি সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য গেজেটভূক্ত। এই গেজেটভূক্তির জন্য এখনো আবেদন জমা পড়ছে। বিপদটা এখানেই, অতীতে যেমন ভুয়া মুক্তিযুদ্ধাদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত যোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন, তেমনি এবার ভুয়া জুলাইযোদ্ধাদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অকার্যকর আওয়ামী সরকার গেছে, অথর্ব অন্তর্বর্তী সরকারও নেই, বর্তমানে জনগণের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়, এখনই জুলাইযোদ্ধাদের নতুন করে গেজেটভূক্ত করার ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে আগামীতে সমুহ বিপদ।
তাছাড়া, জুলাই আন্দোলনের নেতাদের টাকা আছে, অল্প বয়সে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন, তাদের বেপরোয়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
“মুক্তিপণ নিতে এসে ধরা এনসিপির ২ নেতা, তাদের ছাড়াতে গিয়ে গ্রেপ্তার আরও ৩” পত্রিকায় এমন খবর দেখে বড়ই আতঙ্কিত হই। ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি, নিয়োগ বানিজ্য এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই পত্রিকায় দৃষ্টিগোচর হয়। সফল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তারা যে কৃতিত্ব, সম্মান অর্জন করেছিলেন, আজ তা তলানিতে।
এখতিয়ার বহির্ভূত কাজে হাত দেওয়া, বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, মাঝে মাঝে কান্ডজ্ঞানহীন কর্মকান্ডসহ নানা কারণে তারা ইতিমধ্যে সমালোচনার মুখে।
কি দরকার ছিল বলার, আমরা ‘৭১ এর স্বাধীনতা মানি না, শেখ মুজিবকে জাতির পিতা মানি না। বহু ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার প্রতি এত অবজ্ঞা, অপমান যারা করতে পারেন, সবাই বুঝতে পারে- আসলে তারা কারা। ‘৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে যারা কাজ করেছেন, এখন তাদের কন্ঠস্বরেরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।
তবে আমরা আশার আলো দেখি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান যখন বলেন— “আমাদের সরকার মুক্তিযুদ্ধের সরকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি আরও বলেন- “জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি লাভকারী অমুক্তিযোদ্ধা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণকারী ভুয়া সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।”
আমরা এখন মর্যাদাশীল জাতি। বিদেশিরা নেই, দখলদার পাকিস্তানিরাও নেই। আমাদের শাসন আমাদেরই হাতে, দেশ আমরাই গড়বো।
সকলের প্রতিজ্ঞা হোক — আমাদের হৃদয়ে ধারণ করা ‘৭১ এর স্বাধীনতা আমরা কিছুতেই বিপন্ন হতে দেব না।
লেখক : অবসরপ্রপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব্যাংক।
