প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
তসলিমা নাসরিনের ঘরে ফেরা!
২০২৬ জুলাই ১৭ ১৭:৫৫:৪৭
শিতাংশু গুহ
একটি পোষ্টার দেখলাম। তসলিমা নাসরিন কলকাতা ফিরছেন। পহেলা আগষ্ট শনিবার সন্ধ্যায় তিনি রবীন্দ্রসদনে কথা বলবেন। পোষ্টারটি বলছে, ২০বছর পর মুক্ত পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক কবি-লেখক তসলিমা নাসরিন। এর আয়োজক এইচআরবিএফএফ, এর পূর্ণাঙ্গ অর্থ হচ্ছে, ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার’ বা এমন কিছু। উদ্যোক্তা হিসাবে যে ৩জনের নাম আছে এদের মধ্যে ড.মোহিত রায়-র সাথে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। বাকি দু’জন ওসমান মল্লিক ও শান্তনু সিংহ-কে না-চেনাটা আমার ব্যর্থতা। এ তিনজনকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না, এঁরা বলেছেন, এটি পশ্চিমবঙ্গের জন্যে সেক্যুলার মিশন, বিষয়টি তাই।
বলা হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। তিনি উপস্থিত থাকুন বা না থাকুন, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি বা মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত এটি সম্ভব নয়। ২০ বছর আগে ক্ষমতাসীন সিপিএম তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহিস্কার করেছিলো, মূলত: তার ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি প্রকাশের পর। সেই থেকে তিনি কলকাতা যাননি। তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় আসার পর নিষেধাজ্ঞা তুলেননি। সিপিএম বা তৃণমূল কংগ্রেস তসলিমাকে কলকাতায় ঢুকতে দেয়নি মৌলবাদী মুসলিমদের চাপে, তাদের খুশি রাখতে, অথচ ওঁরা নাকি ধর্ম-নিরপেক্ষ, সেক্যুলার? সিপিএম ও তৃণমূল-র চরিত্রটা মূলত: ‘এন্টি-হিন্দু’ ও ‘মুসলিম তোষণ’? এ দুই দলের ৩৪+১৫=৪৯ বছরের শাসন পশ্চিমবঙ্গকে নি:শেষ হয়ে গেছে।
সিপিএম-র আমলে শুরু হলেও তৃণমূল কংগ্রেস বা মমতা ব্যানার্জী’র জমানায় পশ্চিমবঙ্গ ইসলামী মৌলবাদের ‘স্বর্গে’ পরিণত হয়েছিলো, দুই বাংলার জামাত ও ইসলামী সন্ত্রাসীরা মহাসমারোহে পশ্চিমবঙ্গ ও সমগ্র পূর্ব-ভারতকে বিছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিলো। একারণে বাংলাদেশের একশ্রেণীর মুসলমান, বিশেষত: মোল্লারা মমতার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে উঠেছিল। ভাগ্য ভাল যে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা এবার বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে, নইলে ‘খবর আছিলো’। শুনছি যে, পহেলা আগষ্টের অনুষ্ঠানটি মুখ্যতঃ ‘মুক্তচিন্তার সপক্ষে ও মৌলবাদের বিপক্ষে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজন। চমৎকার। তসলিমা নাসরিন নিজেই লিখেছেন, ‘২০ বছর পর মুক্ত বাংলায় প্রত্যাবর্তন’। বোঝা যায়, ‘চটিচাটা’ ছাড়া সবাই এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাইবেন।
তসলিমা নাসরিনের সাথে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের, তবু তিনি বা ড. মোহিত রায়ের সাথে যোগাযোগ না করেই এ লেখাটা লিখছি, যাতে ‘প্রভাবিত’ না হই। তসলিমা তখন বিখ্যাত হয়ে গেছেন, ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরের শেষলঙ্গে ঢাকা গেলে একদা আমার ‘দৈনিক বাংলারবানীর’ সহকর্মী সুধীর কৈবর্তদাস ও কবি আফরোজা নাজরীন আমাকে ‘লজ্জা’ বইটি উপহার দেন্। পড়তে সময় নেইনি, তখনই ‘সাপ্তাহিক সংবাদে’ এক কলামে লিখেছিলাম, তাতে বলেছিলাম, ‘লজ্জা উপন্যাস কিনা জানিনা, তবে লজ্জা আমার বা বাংলাদেশে একজন নির্যাতিত হিন্দুর প্রতিচ্ছবি’। এরপর ১৯৯৪ সালে বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হন। আজো তিনি বিতাড়িত, বাংলাদেশের কোন সরকার তাঁকে ফেরানোর কথা চিন্তাও করেনি?
অনেকদিন আগে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে প্রখ্যাত কলামিষ্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘ঘরের মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে নেয়া উচিত’। তসলিমা নাসরিনের ঘর ‘ঢাকা’ থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতাকে ঘর বানাতে চেয়েছিলেন, মৌলবাদ ও তাদের দোসররা সেটি হতে দেয়নি। বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা তাতে তিনি জীবদ্দশায় আর দেশে ফিরতে পারবেন তা মনে হয়না, তাই অন্তত: অন্তত: কলকাতায় দ্বিতীয় ঘরে তিনি শান্তিতে থাকুন। শোনা যায়, ২রা আগষ্ট ২০২৬ তসলিমা নাসরিন একটি সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারেন। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তসলিমার এই ঘরে ফেরাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তসলিমার সাথে আমার শেষ দেখা বা আলাপ ৩-৫ জুলাই নিউইয়র্কে এনএবিসি আয়োজিত বঙ্গ-সম্মেলনে, সেখানে তিনি একটি চমৎকার সাহিত্যনুষ্ঠান উপহার দেন।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।
