ঢাকা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তিযুদ্ধ » বিস্তারিত

৭১’র যুদ্ধদিনে আমার বাবা গুলিবিদ্ধ

২০২৬ জুলাই ২২ ১৯:০৬:৩৪
৭১’র যুদ্ধদিনে আমার বাবা গুলিবিদ্ধ

অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান আজু


আকাশ বানী শিলিগুড়ি রেডিওতে প্রচারিত সংবাদে জানলাম ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মি ট্যাঙ্ক, গোলা, মেশিনগান প্রভৃতি আধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত হয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানায় ইপিআর হেডকোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা করে গণহত্যা চালিয়েছে। পুলিশ বাহিনী বিদ্রোহ করে পাকিস্তান বাহিনীর হামলা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বিচারে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর উপর গুলি চালিয়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজার হাজার লোককে হত্যা করেছে। সৈয়দপুর সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শতশত বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তান বাহিনী শুধু গুলি চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি। তারা আগুন লাগিয়ে শতশত গ্রাম বাড়িঘর পুড়ে ছাঁই করে দিয়েছে।

রেডিও শিলিগুড়ি আরো জানায়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান আর্মির বাঙালি সদস্য, পুলিশ, ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা দেশপ্রেমিক জনগণের সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধে সামিল হয়েছে। শেখ মুজিব অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।

লোকমুখে খবর পাওয়া গেল - সৈয়দপুরের আশেপাশে বগুড়ায় মুক্তিবাহিনী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সারাদেশে চব্বিশ ঘন্টা কারফিউ জারী করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে বহির্বিশ্বের সমস্ত প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। খবর শুনে বেদনায় ভারাক্রান্ত হবার পাশাপাশি প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা শুনে মন উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।

বর্ডার খুলে দেয়া হলো। পিঁপড়ার সারির মত দলে দলে মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে খানসেনাদের নির্বিচার হত্যালীলা থেকে বাঁচার আশায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে লাগলো। শোনা গেল সৈয়দপুর থেকে পিছু হটে মুক্তিফৌজ বীরগঞ্জের ভাতগাঁ ব্রিজের এপাড়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আরো দু'তিন দিন পর শোনা গেল মুক্তিবাহিনী এখন ঠাকুরগাঁয়। মন ভেঙে গেল। মুক্তি বাহিনী তাহলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছেনা!

খবর শোনা গেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতেই তাঁর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে। চারিদিকে সব আশার আলো বুঝি নিভে গেল। এখন কি হবে?

১৭ এপ্রিল '৭১ খবর পাওয়া গেল খান সেনারা এখন পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড়ে ঢুকেই তারা পঞ্চগড় বাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা আটমাইল দূরবর্তী অমরখানা বোর্ড অফিস থেকে দেখা যাচ্ছে। শোনা গেল খান সেনারা সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে হত্যা করছে। শতশত লোক যে যেভাবে পারছে ভারত সীমান্তের দিকে পালাচ্ছে। সারি সারি ট্রাকে পলায়নপর খাকি পোশাক পরিহিত মুক্তিফৌজ তেঁতুলিয়া অভিমুখে যেতে দেখা গেল।

বাবা চিরকালই একরোখা মানুষ। তিনি বাড়ি থেকে পালাবেন না। তাছাড়া যে ভারতভূমি তিনি ত্যাগ করে পাকিস্তান এসেছিলেন। সেই পাকিস্তান ত্যাগ করে বাঁচার জন্য তিনি ভারতের মাটিতে পা রাখবেন না। গেলে তাঁর ভারতীয় বন্ধুরা বলবে- কি পাইকার সাহেব (এ নামে তিনি সমধিক অভিহিত ছিলেন) শেষ পর্যন্ত আবার ইন্ডিয়াতেই আসতে হলো তোমার সাধের পাকিস্তান ছেড়ে! এ অপমান তিনি সইবেন কেমনে? তাছাড়া তিনি কোন অপরাধ করেন নি। তাহলে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাবেন কেন?

পরদিন সকাল বেলা গরু বাঁধতে বাড়ির পশ্চিমে চাওয়াই নদীর ডাঙায় গিয়েছিলাম। গরু বাঁধা শেষে বাড়ি ফেরার রাস্তায় আমি তখন বোর্ড অফিসের পশ্চিম পার্শ্বে। পূর্ব পার্শ্বে আমাদের বাড়ি। দেখি কি, পাকিস্তানি পতাকাবাহি সারি সারি জীপ আর সেনা ট্রাক। আমি বাড়ির পথে পা না বাড়িয়ে উল্টো নদীর দিকে দৌঁড় দিলাম। কিছুদুর গিয়ে আমার মনে হলো ট্রাক থেকে আমাকে দৌঁড়াতে দেখে খান সেনারা গুলি করতে পারে। আমি তখন পার্শ্ববর্তী একটা জমির আইলের ধারে নিজেকে আড়াল করে শুয়ে পড়লাম। খান সেনাদের জিপ আর ট্রাকের বহর বোর্ড অফিস পার হয়ে অমরখানা বিওপির দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তুমুল গোলাগুলির আওয়াজ শুনে ভয়ে আতঙ্কে উঠে দৌঁড় দিলাম। নদীপাড় ঘেষা ডাঙায় বেঁধে রাখা আমাদের গরুগুলোকে দড়িমুক্ত করে দ্রুত চাওয়াই নদী পার করে প্রথমে ফকিরপাড়া তারপর বোরকা নদী পার হয়ে ডাঙাপাড়া বোন হামিদা'বুর বাড়ি পৌঁছালাম। গরু গুলো বুবুদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী ডাঙায় বেঁধে রাখলাম।বুবু প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন - সকালে খাইছিস কিছু? আমি বললাম - না। তিনি ভাত আর আলুর ভর্তা খেতে দিলেন। খেয়ে মনে হলো জীবনটা বাঁচলো। ওরা আমার কাছ থেকে ঘটনার বৃত্তান্ত শুনলেন। ঘন্টা খানেক আগে যা দেখেছি যা শুনেছি তা ওদের বললাম। গোলাগুলির আওয়াজ তাঁরাও শুনেছে। খানসেনা এসে গেছে শুনে তারাও সবাই উদ্বিগ্ন হলো।কিছুক্ষণ পর খবর পাওয়া গেল। বাবাকে খানসেনারা গুলি করেছে। বাবাকে ভিতরগড় লুদু প্রেসিডেন্টের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখান থেকে তাঁকে ভারতের জলপাইগুড়ি নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করা হবে।

লেখক: সিনিয়র আইনজীবী, পঞ্চগড় জজকোর্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।