প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
হেপাটাইটিসমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি
২০২৬ জুলাই ২৭ ১৮:১৮:০৯
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ নির্ণয়, কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে নির্মূল করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আক্রান্ত মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশ জানেনই না যে তারা ভাইরাস বহন করছেন। ফলে রোগ ধরা পড়ে তখনই, যখন লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য—“Hepatitis: Let's break it down” বা “হেপাটাইটিস: আসুন, বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই”। এ প্রতিপাদ্যের মূল আহ্বান হলো অজ্ঞতা, কুসংস্কার, বৈষম্য, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করে সবার জন্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
হেপাটাইটিস কী?
হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ। ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এর প্রধান কারণ হলেও অতিরিক্ত মদ্যপান, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং অটোইমিউন রোগের কারণেও এটি হতে পারে।
ভাইরাল হেপাটাইটিসের পাঁচটি ধরন—এ, বি, সি, ডি ও ই। এর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ এগুলো দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে থেকে লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া এবং লিভার ক্যানসারের মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই হেপাটাইটিসকে "নীরব ঘাতক" বলা হয়। অধিকাংশ রোগীর প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে একজন ব্যক্তি বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন।
বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের চিত্র:- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি এবং ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস সি নিয়ে বসবাস করছেন। প্রতিবছর প্রায় ১৮ লাখ নতুন সংক্রমণ এবং ১৩ লাখেরও বেশি মৃত্যু ঘটে হেপাটাইটিসজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে।
বাংলাদেশেও হেপাটাইটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। নবজাতকের টিকাদান কর্মসূচির কারণে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ কমলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ এখনও উদ্বেগজনক। সচেতনতার অভাব, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা, সহজে পরীক্ষা ও চিকিৎসা না পাওয়া এবং সামাজিক ভয়ের কারণে অনেক রোগী দেরিতে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি।
কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ, জীবাণুমুক্ত না করা সুচ-সিরিঞ্জ ব্যবহার, অনিরাপদ অস্ত্রোপচার বা দাঁতের চিকিৎসা, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং সংক্রমিত মা থেকে নবজাতকের মধ্যে। রেজার, নখ কাটার যন্ত্র বা টুথব্রাশ ভাগাভাগি করেও সংক্রমণ হতে পারে। তবে করমর্দন, আলিঙ্গন, একসঙ্গে খাওয়া, কাশি-হাঁচি বা একই বাসন ব্যবহারের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সামাজিক বৈষম্য বা অযথা ভয় প্রদর্শনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সংক্রমিত মায়ের নবজাতক, গর্ভবতী নারী, স্বাস্থ্যকর্মী, ডায়ালাইসিস রোগী, বারবার রক্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী, অনিরাপদ যৌন আচরণে অভ্যস্ত ব্যক্তি এবং কারাগারে থাকা জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
লক্ষণ ও রোগ নির্ণয়:- প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না। পরে দুর্বলতা, জ্বর, ক্ষুধামন্দা, বমি, জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব, পেটের ডান পাশে ব্যথা এবং শরীর চুলকানোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগ নির্ণয়ের জন্য HBsAg, Anti-HCV, HBV DNA, HCV RNA, Liver Function Test (LFT), আল্ট্রাসোনোগ্রাম এবং FibroScan গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিং রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
আধুনিক চিকিৎসায় আশার আলো
বর্তমানে হেপাটাইটিস বি সম্পূর্ণ নির্মূল করা না গেলেও কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি আধুনিক Direct Acting Antiviral (DAA) ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তাই রোগ ধরা পড়লেই হতাশ হওয়ার কারণ নেই; বরং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
হেপাটাইটিসে হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা
হোমিওপ্যাথির মূলনীতি হলো—"রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা"। অর্থাৎ রোগীর শারীরিক গঠন, মানসিক অবস্থা, রোগের পর্যায়, উপসর্গের ধরন, লিভারের কার্যক্ষমতা, পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস এবং পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চেলিডোনিয়াম মেজাস, কার্ডুয়াস মেরিয়ানাস, লাইকোপোডিয়াম, নাক্স ভোমিকা, ফসফরাস, চায়না অফিসিনালিস, মার্কিউরিয়াস সলিউবিলিস, নেট্রাম সালফিউরিকাম, সালফার, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, ব্রায়োনিয়া, পালসেটিলা, ক্যালকেরিয়া কার্বোনিকা, সেপিয়া, কালি মিউরিয়াটিকাম, ফেরাম ফসফরিকাম, আইরিস ভার্সিকালার, পোডোফাইলাম, কিওনান্থাস ভার্জিনিকা, মাইরিকা সেরিফেরা, হেপার সালফিউরিস, থুজা অক্সিডেন্টালিস, গ্রাফাইটিস, সিলিসিয়া এবং ফেরাম মেটালিকাম প্রভৃতি ওষুধ নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বিবেচনা করতে পারেন।
তবে হেপাটাইটিসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই নিজে নিজে ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। জন্ডিস, তীব্র দুর্বলতা, রক্তক্ষরণ, পেটে পানি জমা, অতিরিক্ত বমি বা অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। হেপাটাইটিস বি ও সি-এর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা, নিয়মিত ফলো-আপ ও পরীক্ষার বিকল্প নেই। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।
প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়:- হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো হেপাটাইটিস বি টিকা। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে এই টিকা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিরাপদ ও পরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ, জীবাণুমুক্ত সুচ-সিরিঞ্জ ব্যবহার, নিরাপদ যৌন আচরণ, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ভাগাভাগি না করা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্ক্রিনিং নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের করণীয়:- হেপাটাইটিস নির্মূলে শুধু ব্যক্তি সচেতনতা যথেষ্ট নয়; সরকারেরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জেলা পর্যায়ে সহজলভ্য স্ক্রিনিং, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, শতভাগ নবজাতক টিকাদান, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে।
শেষকথা:- হেপাটাইটিস একটি প্রতিরোধযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য রোগ। তবুও সচেতনতার অভাব, দেরিতে রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ না করার কারণে এটি এখনও বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—অজ্ঞতা, অবহেলা ও বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে সবাইকে পরীক্ষা, টিকাদান এবং কার্যকর চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠতে পারে হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ। সুস্থ লিভার মানেই সুস্থ জীবন, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সচেতনতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক : কলাম লেখক, জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও গবেষক।
