প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
“হিন্দু সম্পত্তি গনিমতের মাল”
বাংলাদেশে নিপীড়িত হিন্দুদের নিয়ে একাধিক অমর মহাকাব্য হতে পারে
২০২৬ জুলাই ২৮ ১৭:২৯:০৭
শিতাংশু গুহ
সামাজিক মাধ্যমে এক মহিলা লিখেছেন: ‘এ বয়সে চোখের সামনে কত হিন্দুর সম্পত্তি মুসলমানদের দখল করতে দেখলাম, কিন্তু তা আজো থামলো না’। মহিলা আমার ফেইসবুক বন্ধু, বয়স ঠিক জানিনা, তবে কথবার্তায় চল্লিশ পার হয়েছেন বলে মনে করিনা। সেই তুলনায় আমি যা দেখেছি তা বলে শেষ করা যাবেনা। শুধু বলি, ষাটের দশকে আমি যখন ছোট তখন দেখেছি চাঁদপুর শহরের প্রায় অধিকাংশ বাড়ী-ই হিন্দু’র, আর এখন চাঁদপুরে মাঝেমধ্যে হিন্দুর বাড়ী খুঁজে পাওয়া যায়। আমার একটি বইয়ে আমাদের পরিবার নিয়ে লিখতে গিয়ে চাঁদপুরের কাহিনী বিস্তৃত লিখেছি, শেষে প্রশ্ন করেছি, ‘এতবড় একটি পরিবার কেন চাঁদপুর থেকে হারিয়ে গেলো, এর কারণ কি, এর দায় কার?
ঐ মহিলা যা দেখেছেন তা প্রায় প্রতিটি হিন্দু দেখেছেন, অনেকেই ভুক্তভুগী। মুসলমানরাও দেখেছেন, স্বীকার করেন সামান্য কিছু মানুষ। আমার অন্য একটি বইয়ে আমি লিখেছি, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি কালে যদি আপনার পূর্ব-পুরুষের বাড়ী না থেকে থাকে, তাহলে আপনার পূর্ব-পুরুষ হয় হিন্দুর থেকে সম্পত্তি কিনেছেন, অথবা জোর করে দখল করেছেন অথবা কম-পয়সায় ঠকিয়ে হিন্দুর সম্পত্তি দখল নিয়েছেন। অনেকে ‘অর্পিত সম্পত্তি (শত্রু-সম্পত্তি)’র নামে দখল নিয়েছেন। কি রাগ করলেন? রাগ করলেও সত্য সত্যই থাকবে। ভবিষ্যৎ এনিয়ে সত্য কাহিনী প্রকাশিত হবেই, হয়তো আমরা থাকবো না, কিন্তু আপনার পরবর্তী প্রজন্ম সত্য জেনে লজ্জ্বিত হবে?
শুধু মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই একাজ করছে। নেতারা করেছে। সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র এ অপকর্ম করতে উদবুদ্ধ করেছে। শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তি কালো আইনের কথা আগেই বলেছি, শুধুমাত্র এই আইন প্রয়োগ করে রাষ্ট্রযন্ত্র ২০১১ পর্যন্ত ২৭ লক্ষ একর হিন্দু-সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে মুসলমানকে দিয়েছে, বহু সরকারি অফিস-আদালত এই শত্রু-সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ আইন নিয়ে বহু নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, শুধু অধ্যাপক আবুল বারাকাতের একটি বই এজন্যে যথেষ্ট। এই আইনের যাঁতাকলে হিন্দুরা নি:স্ব হয়ে গেছে। আইনটি এখন নেই, কিন্তু এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া থেমে যায়নি। এই আইন রদ হবার পর কোন হিন্দু সম্পত্তি ফেরত পেয়েছে তা শোনা যায়নি।
তদানিন্তন পাকিস্তানে ‘জমিদারী প্রথা বাতিল’ সম্পর্কে অনেকেই জানেন, সেটি ১৯৫০ সালের ঘটনা। অনেকেই বিশেষত: বামপন্থীরা তখন খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, পাকিস্তান তাদের একটি এজেন্ডা পূরণ করেছে। বিষয়টি তা ছিলোনা, এ পদক্ষেপ ছিলো ‘সাম্প্রদায়িক’ এবং এটি করা হয়েছিলো হিন্দুর সম্পত্তি কেঁড়ে নেয়ার জন্যে। ক্যামনে? কারণ জমিদারি স্বত্ব আইনটি বাতিল হয়েছিলো শুধু পুর-পাকিস্তানে, কেননা জমিদাররা ছিলো হিন্দু। পশ্চিম-পাকিস্তানে তা বাতিল হয়নি, কারণ জমিদাররা ছিলো মুসলমান। মাওলানা ভাষানীর সন্তোষের বাড়ীটি তেমনি একটি দখলকৃত হিন্দু জমিদার বাড়ী। এতবড় নেতা যখন হিন্দু সম্পত্তি দখল করে তখন অন্যদের আর দোষে দিয়ে লাভ কি?
ফরিদপুরের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এখন যে বাড়ীতে থাকেন সেটি অরুন গুহ মজুমদারের বাড়ী। আগে তিনি যে বাড়িতে থাকতেন লোকমুখে সেই বাড়ির নাম ছিলো ‘নুরু রাজাকারের বাড়ি’, কারণ বোধগম্য। অরুন গুহ মজুমদারের বাড়িতে ম্যুভ হয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। তখন তিনি মন্ত্রী ৭০ কোটি টাকার বাড়িটি তিনি ন্যায্য মূল্যে মাত্র ২০লক্ষ টাকা দিয়ে কিনেছেন। তাও দিতে বাধ্য হয়েছেন জানাজানি হবার পর? সিলেটের দানবীর রাগীব আলীর মাহাত্ম্য আপনারা শুনে থাকবেন, তাঁর সকল সম্পত্তি, চা-বাগান হিন্দুর থেকে জোর করে দখল করা? সুপ্রিমকোর্ট একবার তার সম্পত্তি হিন্দু মালিককে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়? কিন্তু মেয়র ব্যারিষ্টার তাপস যখন ১শ’ কোটি টাকার বিনিময়ে তাঁর উকিল হ’ন, তখন বেচারা হিন্দুর আর কিছু করার থাকেনা। রাগিব আলী হিন্দু সম্পত্তির জোরে দানবীর ‘হাজি মহসিন’ হয়ে যান।
এমপি দিদারুল-র কথা নাইবা বললাম। কত ঘটনা দেবো? এরকম হাজার হাজার ঘটনা আছে? ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন যখন অরুন গুহ মজুমদারের সম্পত্তি দখল করছিলেন ঠিক তখন প্রখ্যাত কলামিষ্ট একুশে গানের রচয়িতা প্রায়ত: আবদুল গাফফার চৌধুরী নিউইয়র্কে এসেছিলেন। হাঁটতে তাঁর তখন কিছুটা সাহায্য লাগে, আমি তাঁকে ধরে এগিয়ে নিচ্ছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, গাফফার ভাই, মন্ত্রী মোশাররফ তো অরুন গুহ মজুমদারের সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছে? তিনি হেসে উত্তর দিলেন, শিতাংশু, ‘হিন্দুর সম্পত্তি তো গনিমতের মাল’। তিনি আরো কিছু বলেছিলেন, সেইসব না-ই বললাম। ঐসময় ক’জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, একজন মন্ত্রী ও একজন রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি ছিলো একেবারে ঘরোয়া এবং গাফফার চৌধুরী স্পষ্ট ও সোজাকথা বলতে পছন্দ করতেন। তাঁর মৃত্যুতে হিন্দুরা একজন বন্ধু হারিয়েছে।
বাংলাদেশে হিন্দু সম্পত্তি দখল বা এই জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক নির্যাতন নিয়ে একাধিক মহাকাব্য হতে পারে। কোন মহাকবি লিখবেন সেই মহাকাব্য জানিনা, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব-বাংলা, পূর্ব-পাকিস্তান বা আজকের বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আট দশকের বেশি সময় ধরে চলমান বীভৎস সাম্প্রদায়িক নির্যাতন নিয়ে বিশ্ব মুখ ফিরিয়ে থাকলেও মানবতাবাদী কবি-সাহিত্যিকরা আগামী দিনে পিছিয়ে থাকবেন তা মনে হয়না। সময় এসেছে বাংলাদেশের এই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর। আমার সদ্য প্রকাশিত ইংরেজী বই, “বাংলাদেশ: এক্সটিংশন অফ হিন্দুজ ইন গ্লোবাল কনটেক্সট”-এ আমি সেই চেষ্টা করেছি। বইটি আমাজনে পাওয়া যাচ্ছে, আপনি যেদেশে থাকুন, আমাজন থেকে বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে শুধুমাত্র ইউনুস আমলের ১৮ মাসের ঘটনা দিয়ে সমগ্র পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।
