ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

বন্ধ শিল্প চালু হোক, ফিরুক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার গতি

২০২৬ জুলাই ২৮ ১৭:৩১:০৭
বন্ধ শিল্প চালু হোক, ফিরুক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার গতি

মীর আব্দুল আলীম


সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সেই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হবে বন্ধ শিল্প চালু করা, রুগ্ণ শিল্পকে পুনর্জীবিত করা এবং সচল শিল্পকে টিকিয়ে রাখা। দেশের বন্ধ শিল্প কারখানার চালু হলে, ফিরবে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার গতি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নয়; বরং টিকে থাকা বিদ্যমান শিল্পকে ধরে রাখা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু করা। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে অসংখ্য গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও নিটিং কারখানা হয় ধুঁকছে, না হয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কোনোটি গ্যাস, বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জাঁতাকলে পড়েছে, কোনোটি ব্যাংকঋণের বোঝা বইতে পারছে না। আবার কোথাও প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও যথাযথ নীতির অভাবে বছরের পর বছর ধরে উৎপাদন থমকে আছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, নতুন শিল্প স্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। কিন্তু যেসব কারখানায় ভবন, যন্ত্রপাতি, দক্ষ শ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক বাজার সবই প্রস্তুত, সেগুলো চালু করতে তুলনামূলক কম সময় ও কম ব্যয় লাগে। তাই দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর বিকল্প নেই।

একটি নতুন শিল্প তৈরি করতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, সেখানে এসব বন্ধ বা রুগ্ণ কারখানা সহজে ও দ্রুত সচল করা সম্ভব। এগুলো পুনরায় চালু করতে পারলে খুব অল্প সময়ে একদিকে যেমন বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ফিরবে, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতেও দ্রুত গতি ফিরবে।
চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা রুগ্ণ শিল্পকে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকার নীতিগত সহায়তা ও সহজ শর্তে অর্থায়নের মাধ্যমে পাশে দাঁড়ায়। সেসব দেশে একটি শিল্প কারখানা কেন বন্ধ হল তা খতিয়ে দেখা হয় এবং সহযোগিতার হাত বাড়ায় সরকার। বাংলাদেশ সরকারও যদি সেই আদলে বন্ধ ও সংকটাপন্ন কারখানাগুলোকে রক্ষায় কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়, তবে দেশীয় শিল্প খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি কারখানার গেট বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষের জীবিকা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় অর্থনীতি, কমে যায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দুর্বল হয় রপ্তানি সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ যথাযথ নীতিগত সহযোগিতা, জ্বালানির নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় পেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে। বস্ত্রশিল্প শুধু একটি খাত নয়, জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিও বটে! বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত থেকে। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। একটি গার্মেন্টসের পেছনে স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, প্যাকেজিং, পরিবহন, ব্যাংকিং, বন্দর, কাঁচামাল সরবরাহসহ বিশাল অর্থনৈতিক শৃঙ্খল কাজ করে।

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট এখন শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা। দেশের অসংখ্য টেক্সটাইল ও স্পিনিং কারখানা বিদ্যুৎ এবং পর্যাপ্ত গ্যাসচাপের অভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতার নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে শুধু অর্ডার বাতিলই হয়নি, বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য শিল্পের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। উৎপাদন ব্যয় যখন প্রতিযোগী দেশের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি মূল্যনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা জরুরি।

একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, যা দেশের বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিচ্ছবি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকার লাগোয়া রূপগঞ্জের বরপা এলাকার অন্তিম গার্মেন্ট গ্যাসের বিল বকেয়ার কারনে বন্ধ রয়েছে। কিস্তিতে বকেয়া পরিষোধ করতে চাইলেও কোন সুযোগ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে শতভাগ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্যাস-সংক্রান্ত জটিলতা ও বকেয়া বিলের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। বকেয়া কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব এবং বিষয়টি আদালতের প্রক্রিয়ায় থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে উৎপাদন এখনও শুরু করা যায়নি। বিষয়টি যদি দ্রুত নিষ্পত্তি করে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ১৫ হাজারো মানুষ আবার কাজে ফিরতে পারবেন এবং রাষ্ট্র পুনরায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পাবে।

শুধু অন্তিম গ্রুপ নয় রাজধানীর লাগোয়া সাভার, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, নরসিংদী, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও গার্মেন্টস খাতের বহু প্রতিষ্ঠান একই ধরনের সংকটে রয়েছে। অনেক কারখানা আংশিক উৎপাদনে চলছে, আবার অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। এগুলোর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

সবার আগে বিদেশি ক্রেতার আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা সময়মতো পণ্য না পেলে তিনি অন্য দেশে চলে যান। হারানো ক্রেতাকে ফিরিয়ে আনা নতুন ক্রেতা পাওয়ার চেয়েও কঠিন। তাই উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখন কৌশলগত প্রয়োজন। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকার শিল্পকে শুধু করদাতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখে। জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সহায়তায় তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশেও শিল্পবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি আরও জোরদার করতে হবে।

এ অবস্থায় সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে ক্ষতিয়ে দেখা- দেশে কতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, কতটি রুগ্ণ, কেন বন্ধ হয়েছে? আর কোনগুলো দ্রুত চালু করা সম্ভব। এসব বিষয়ে একটি জাতীয় তালিকা প্রস্তুত করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান নিশ্চিত করা।

যেসব প্রতিষ্ঠান সাময়িক সংকটে পড়েছে, তাদের জন্য পুনঃতফসিল, স্বল্পসুদে ঋণ, গ্যাস সংযোগ পুনর্বহাল, বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক সহায়তার সমন্বিত প্যাকেজ প্রয়োজন। একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে শুধু শ্রমিকই নয়, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, হোটেল, দোকান, ব্যাংক সবাই উপকৃত হন। শিল্প সচল থাকলে পুরো এলাকার অর্থনীতি সচল থাকে।

শিল্প খাত রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন চাই আমরা। প্রধানমন্ত্রী যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, তার বাস্তব প্রতিফলন হওয়া উচিত মাঠপর্যায়ে। শিল্প মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে অচল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বড় সুযোগ রয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি যদি সরকার বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্জীবিত করার একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার নয়, লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। বাড়বে রপ্তানি, শক্তিশালী হবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ফিরবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং দেশের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

রাষ্ট্রের প্রতি আজ তাই একটাই বিনীত আহ্বান, শুধু নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, আগে বিদ্যমান শিল্পকে বাঁচান। বন্ধ কারখানার চিমনিতে আবার ধোঁয়া উঠুক, রুগ্ণ শিল্পে ফিরুক প্রাণ, শ্রমিকের ঘরে ফিরুক হাসি। কারণ শিল্প বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে, কর্মসংস্থান বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি শক্তিশালী হলে তবেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট।