ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » খেলা » বিস্তারিত

প্রতিশ্রুতি দিয়েও অর্থ দিচ্ছে না ফিফা 

২০২৬ আগস্ট ০৫ ১৪:১৪:২৭
প্রতিশ্রুতি দিয়েও অর্থ দিচ্ছে না ফিফা 

স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক মার্কিন শহরগুলো ফিফার কাছে তাদের প্রাপ্য লাখ লাখ ডলারের পাওনা আদায়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। শহরগুলোর দাবি, ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের এই অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও পরিশোধ করা হয়নি।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপের আগে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা করেছিলেন যে, এই টুর্নামেন্টের আয়োজক ১১টি শহরের প্রত্যেকটিকে ফিফা ১ মিলিয়ন ডলার করে অনুদান দেবে। একে ‘লিগ্যাসি কন্ট্রিবিউশন’ বা ঐতিহ্য রক্ষার অনুদান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, এই অর্থ মিনি-পিচ নির্মাণ এবং বিভিন্ন ‘সামাজিক প্রকল্পে’ ব্যয় করা হবে।

ইনফান্তিনোর এই ঘোষণার পর, ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলো জানতে চায় যে, ৩৯ দিনব্যাপী চলা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিশ্বকাপের জন্য তারাও একই ধরণের ১ মিলিয়ন ডলারের অনুদান পাবে কি না।

আয়োজক কমিটির চারজন শীর্ষ কর্মকর্তার তথ্যমতে, ফিফা ম্যানেজম্যান্ট শহরগুলোকে বারবার মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে তারাও লিগ্যাসি ফান্ডের ১ মিলিয়ন ডলার করে পাবে। যদিও ফিফা এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য বিবৃতি কখনও দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজক শহরগুলোর মধ্যে ছিল সিয়াটল, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া, লস অ্যাঞ্জেলস, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, আটলান্টা, ফিলাডেলফিয়া, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি, মায়ামি এবং বোস্টন।

আয়োজক কমিটির ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফিফার শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকরা শহরগুলোর সঙ্গে সভায় এই মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। ফলে বেশ কয়েকটি শহর এখন ফিফা কর্মকর্তাদের কাছে এই বকেয়া পেমেন্টের সর্বশেষ আপডেট জানতে চাইছে।

এই বিষয়ে ফুটবল বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘দ্য অ্যাথলেটিক’ ফিফার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

শহরগুলোর জন্য সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে কারণ টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর অনেক আয়োজক কমিটি এখন তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে টাকাটা আসলেও তা কোন মাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক শহরকে তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হচ্ছে, যেখানে এই পাওনা অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না তা নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

দুজন কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে, একটি সংস্থা যারা ২০২৩-২৬ চক্রে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে, তারা কীভাবে এই সামান্য অর্থ দিতে গড়িমসি করছে? অথচ এই শহরগুলোই নিজেদের ভর্তুকি দিয়ে টুর্নামেন্টটি সফল করেছে এবং ফিফাকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনে সহায়তা করেছে। উল্লেখ্য, এই টুর্নামেন্টের জন্য ফিফার নিজস্ব অপারেটিং বাজেট ছিল প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য এটি বর্তমানে একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় সংস্থা উয়েফা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সহযোগীদের কাছ থেকে তীব্র চাপের মুখে আছেন। বিশেষ করে বিশ্বকাপের শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের বড় একটি অংশ জুগিয়েছে মার্কিন করদাতারা। নিরাপত্তা, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং অপারেশনাল কাজে ব্যয় হয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং পার্কিং থেকে আয়ের সিংহভাগ ফিফার পকেটে গেলেও শহরগুলোকে বহন করতে হয়েছে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিশাল খরচ। এমনকি ফিফা ফ্যান ফেস্ট এলাকা, বিমানবন্দর এবং টুর্নামেন্টে ব্যবহৃত যানবাহনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও ছিল শহরগুলোর ওপর।

কানসাস সিটির উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। তারা জানিয়েছে, টুর্নামেন্টের জন্য মিসৌরি রাজ্য থেকে ৪২.৫ মিলিয়ন ডলার, কানসাস রাজ্য থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলার এবং কানসাস সিটি থেকে ১৪.৮ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ৮৬.৮ মিলিয়ন ডলার সরকারি বিনিয়োগ পেয়েছে। এর বাইরে ফেডারেল নিরাপত্তা সহায়তা বাবদ ৫৯.৫২ মিলিয়ন ডলার এবং যাতায়াত খাতের অনুদান হিসেবে ১৩.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

এর বাইরেও বিভিন্ন বেসরকারি অনুদান ছিল যা কমিটি প্রকাশ করেনি। এছাড়া ফিফাকে আকৃষ্ট করতে মিসৌরি রাজ্য বিশ্বকাপের টিকিটের ওপর বিক্রয় কর মওকুফ করেছিল। এর ফলে প্রায় ১৫.৬ মিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে রাষ্ট্র, যা প্রকৃত অর্থে আরও বেশি হতে পারে।

আয়োজক শহরগুলোর বাধ্যবাধকতার মধ্যে আরও ছিল ফিফা নির্ধারিত ভিআইপিদের জন্য বিশেষ ট্রাফিক লাইন এবং পুলিশ এসকর্ট প্রদান। এছাড়া ‘ক্লিন স্টেডিয়াম’ নিশ্চিত করতে অর্থাৎ ফিফার বাইরের কোনো ব্র্যান্ডিং মুছে ফেলতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজনের উপযুক্ত পিচ তৈরির জন্যও অতিরিক্ত ১৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে।

টুর্নামেন্টের আগে থেকেই খরচের বোঝা কে বহন করবে তা নিয়ে শহরগুলোর মধ্যে চরম অসন্তোষ ছিল। তবে ফিফা সবসময়ই দাবি করে আসছিল যে, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে। ফিফা প্রায়ই একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিত যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে, এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিতে ৩০.৫ বিলিয়ন ডলারের ইনজেকশন পড়বে। তবে বাস্তবে সামান্য ১ মিলিয়ন ডলারের বকেয়া পাওনা নিয়ে শহরগুলোর মধ্যে এখন তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

(ওএস/এএস/আগস্ট ০৫, ২০২৬)